রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির হলরুমে শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় প্রতিনিধি সভায় অংশ নেওয়া কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগঠনের নেতারা জানান, দেশের কৃষক ও মাঠের শ্রমিকরা এখন মারাত্মক সমস্যার মুখে। সারের কৃত্রিম সংকট ও কালোবাজারি, বিদ্যুতের ঘাটতি ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়া—এসব কারণে গ্রামীণ কর্মজীবী পরিবারগুলো হতাশার শিকার।
সভায় তুলে ধরা মূল অভিযোগ
সভায় বক্তব্য পরিবেশনকারীরা বলেছিলেন, সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌলতে কৃষকরা ন্যায্য দামে ফসল বিক্রি করতে পারছেন না। এছাড়া সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম গত সময়গুলোতে বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ কখনো আগে দেখা যায়নি তাতে পৌঁছেছে। অধিকন্তু, গ্রামীণ এলাকায় লোডশেডিংয়ের কারণে সৌর বা অননুমোদিত জেনারেটর ছাড়া সেচ, পশুপালন ও পুকুরের ব্যবস্থাও বেগতিক হচ্ছে বলে নেতারা জানান।
বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর ও কৃষক সংগঠনের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক আহসানুল আরেফিন তিতু সভাপতিত্বে সভায় কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মাসুদ রানা, কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অজিত দাস ও অন্য নেতা-নেত্রীরা বক্তব্য দেন। রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও জয়পুরহাট থেকে আগত প্রতিনিধিরাও তাদের জেলার বিশেষ সমস্যা তুলে ধরেন।
কী দাবি উঠেছে মঞ্চে
সভায় প্রধানত যে দাবিগুলো উচ্চারিত হলো, সেগুলোকে সংক্ষিপ্তভাবে ভাগ করলে উঠে এল—
- সারের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং কালোবাজারি রোধ।
- বিদ্যুৎ সংকট নিরসন ও গ্রামীণ লোডশেডিং বন্ধ।
- ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সরাসরি ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবস্থা।
- ধলতা প্রথা বাতিল করা ও শ্রমিক-কৃষকের অধিকার রক্ষা।
- বিশ্ববাজার-ভিত্তিক বাণিজ্যচুক্তি পর্যালোচনা—বিশেষত আমেরিকার সঙ্গে করা যেকোনও চুক্তি কৃষকের অনুকূলে না হলে তা বাতিলের দাবি।
সভায় বক্তারা লক্ষ্য করেন, দেশের ভূমিকম্প নয়—বরং নীতিনির্ধারণ ও বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতায় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সারের অভাবে বীজতলা পর্যায়ে উৎপাদন কমে যাচ্ছে, আর অনুকূল ফলন না পাওয়ায় আয়ের হার কমছে—ফলে খেতের শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা বিপন্ন হচ্ছে।
গ্রামীণ জীবনে প্রভাব ও উদ্বেগ
রিপ্রেজেন্টেটিভদের বক্তব্যে বলা হয়, লোডশেডিংয়ের কারণে কোরবানির বরখাদ্দ পশুপালন, হাঁস-মুরগি ও জলজ খামারগুলোর কাজ ব্যাহত হচ্ছে। প্রচলিত সেচ ব্যবস্থায় বিভ্রাটের কারণে রোপণ চক্রক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। কৃষকেরা বলে চলেছেন, বাজারে সঠিক মূল্যে পণ্য বিক্রি না করতে পারলে তাদের ঋণগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
সভাপতির কণ্ঠে এবং মঞ্চে উপস্থিত নেতা-নেত্রীরাই বারবার জোর দিয়েছেন—শিল্পপতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে না হলে আন্দোলন চলমান থাকবে। দফায় দফায় সংগঠিত করে মাঠে বাধ্যতামূলক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলেও তারা জানান।
সমাপনী মিছিল ও বিক্ষোভ
প্রতিনিধি সভা শেষে পাবলিক লাইব্রেরি মাঠ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি নগরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে শেষে প্রেসক্লাব চত্বরে এসে সমাপ্ত হয়। স্থানীয়রা জানান, মিছিল শান্তিপূর্ণ ছিল এবং এতে কৃষক প্রতিনিধিরা পাশাপাশি সার-বিদ্যুৎ ও বাজার ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে রাখেন।
| আয়োজন | স্থান | প্রধান দাবি |
|---|---|---|
| বিভাগীয় প্রতিনিধি সভা ও মিছিল | রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি; প্রেসক্লাব চত্বরে মিছিল সমাপ্তি | সার-বিদ্যুৎ সংকট ও কালোবাজারি রোধ; ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত; ধলতা প্রথা বাতিল; আমেরিকার সঙ্গে হওয়া চুক্তি বাতিল |
স্থানীয় নেতৃত্ব থেকে সভার পর করা একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি অনুযায়ী, আগামী দিনে দাবি আদায়ের জন্য কেন্দ্রীয় স্তর থেকে আরও সংগঠিত কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। উপস্থিত অনেক কৃষক জানিয়েছেন, কারিগরি সাহায্য, সারের সুষ্ঠু বিতরণ ও স্থায়ী বিদ্যুৎযোগ না হওয়া পর্যন্ত তাদের চাপ অব্যাহত থাকবে।
রংপুর থেকে ফরহাদুজ্জামান ফারুক প্রতিবেদন করেছেন।