আশির দশকের গ্রামীর সন্ধ্যার স্মৃতি নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করল ছায়াময় এক পুথিপাঠের আসর। পাবনার চাটমোহরের বিলচলন ইউনিয়নের সোনাহারপাড়া (সগুনাপাড়া) গ্রামে বৃহস্পতিবার রাত ৯টা থেকে রাত সওয়া ১০টা পর্যন্ত গ্রামের উঠোনে বসে শত শত মানুষ পুথিপাঠ শুনে মুগ্ধ হয়েছেন।
স্থান ও আয়োজক
আয়োজনটি কিতাব প্রামাণিকের বাড়ির উঠোনে হয়। বাতি-আলোকের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও শরতের চাঁদের আলো মিলিয়ে গড়ে উঠেছে পুরোনো দিনের ছন্দ—কুপির আলোর মাঝেই পাঠ অব্যাহত থাকে। এ ধরনের আয়োজনের সূচনা ও সমন্বয় করেছেন চিকিৎসক ডা. আতিকুর রহমান আতিক, যিনি একই সঙ্গে অনুষ্ঠানের আয়োজনকর্তা ও শুরুতে মুখবন্ধ পাঠও করেন।
পাঠ ও পরিবেশীদের তালিকা
| ক্রমিক | পাঠকারী/পরিবেশক | করার দায়িত্ব |
|---|---|---|
| ১ | আসাদুজ্জামান দুলাল | মূল পুথিপাঠ |
| ২ | লইমুদ্দিন প্রামাণিক | গাজী কালু ও চম্পাবতী পাঠ |
| ৩ | মায়াবী (গায়িকা) | গায়ন পরিবেশন |
আসরের মুহূর্ত এবং সাড়া
ভূমির স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার মতো উপস্থিতি ছিল বিভিন্ন বয়সী—শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বয়সে প্রবীণ গ্রামীণ মানুষও। পাঠ চলার সময়ও উঠোনে কাউকে ঘরের কাজ বা মোবাইল ফোন বিচলিত করতে দেয়নি; জ্যোৎস্না রাত ও কুপির আলোর মিশেলে তৈরি হয় নিস্তব্ধ এক পরিবেশ।
আসরের নির্দিষ্ট অনুষঙ্গ ছিল:
- রাতের নির্ধারিত সময়: সন্ধ্যায় ৯টা থেকে সওয়া ১০টা পর্যন্ত
- পাঠের শুরুতে আয়োজকের মুখবন্ধ
- পাঠ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় পুরনো কাহিনির পাঠ ও গান
গ্রামবাসীর প্রতিক্রিয়া
বয়সে প্রায় ৭৫ বছর হয়ে পড়া কৃষক হাসান প্রামাণিক জানান, তিনি চার দশক আগে এসবই নিয়মিত দেখেছেন। অনুষ্ঠানের পরে স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন—
“৪০ বছর আগে শুনেছিলাম এই পুথিপাঠ। কাজের অবসরে রোজ সন্ধ্যায় আসরে বসতাম।”
অন্য এক প্রতীক্ষী দর্শক, অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ইমদাদুল হক, জানান যে শিশুকাল থেকেই গ্রামের বেলায় পুথিপাঠের দৃশ্য তাঁর কাছে অতি পরিচিত ছিল এবং এই আয়োজন দেখলে শৈশবের স্মৃতি ফের জাগে। নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণও ছিল লক্ষণীয়; যেমন ফয়সাল মাহমুদ নামের এক তরুণ তার বাবাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন এবং সে বলেছে, এটি তাঁর প্রথম অভিজ্ঞতা—পুথিপাঠ দেখে তাকে ভালো লেগেছে।
পুথিপাঠ–ঐতিহ্য সংরক্ষণে আহ্বান
স্থানীয় সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিক মহলও আয়োজনকে গুরুত্ব দিয়েছেন। চাটমোহর প্রেস ক্লাবের নবনির্বাচিত সভাপতি রকিবুর রহমান টুকুন বলেন যে এমন উদ্যোগ বজায় রাখতে সরকারি সহায়তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে—একথা তিনি প্রকাশ্যে উত্থাপন করেছেন।
অনুষ্ঠান শেষে পাঠক ও শিল্পীদের সম্মানে ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়—আয়োজকরা অংশগ্রহণকারীদের সম্মাননা দেন।
স্থানীয় প্রভাব ও ধারাবাহিকতা
গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিন কুটিরচর্চা থেকে বিচ্যুত হয়ে গেলে লোককথা, পল্লীগীতি ও পুথি-সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা বেড়ে যায়। এই পুথিপাঠের আসর স্থানীয় মানুষের মধ্যে পুরনো ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করেছে এবং বহু প্রবীণ ও তরুণের মধ্যে স্মৃতিচারণ ও শিক্ষামূলক আড্ডার শুরু ঘটিয়েছে। আয়োজকরা জানান, যদি উৎসাহ বজায় থাকে ও যৌক্তিক সহায়তা পাওয়া যায়, ভবিষ্যতে এমন আয়োজন নিয়মিত করা সম্ভব।
স্থানীয় সমাজে এমন উদ্যোগকে শুধু বিনোদন হিসেবে নয়, বরং সাংস্কৃতিক শিক্ষার একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে। পুথিপাঠের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীরা পুরনো গল্প, চরিত্র ও ভাষার ভাব-অভিব্যক্তি সরাসরি শুনতে পাচ্ছে—যা ট্যানশনেশনাল শিক্ষার বিকল্প হলেও অদূর ভবিষ্যতে সাংস্কৃতিক ধারাকে সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।