রংপুরের আলু চাষিরা চলতি মৌসুমে বাজারমূল্য ও হিমাগার ভাড়ার চাপের সম্মিলিত প্রভাবে বড় আয়ের ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। জেলা ফসল উৎপাদন ও ব্যবসার অ্যানালাইসিস অনুযায়ী উৎপাদন খরচ ও সংরক্ষণের খরচ মিলিয়ে আলুর প্রতি কেজির বাস্তব ব্যয় গড়ে প্রায় ২৩ টাকা, কিন্তু হালনাগাদ বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৫ থেকে ১৬ টাকা প্রতি কেজিতে। এর ফলে প্রতিকেজি ৭-৮ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে কৃষকদের।
ক্ষতির পরিস্তিতি ও উদাহরণ
পীরগাছার পারুল ইউনিয়নের কৃষক হুমায়ন খান ব্লকবিস্তারে ১৮ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন এবং উৎপাদিত আলু থেকে তিনি ২ হাজার বস্তা হিমাগারে জমা রেখেছেন। এ পর্যন্ত তিনি মাত্র ১৪ বস্তা বিক্রি করতে পেরেছেন। একই উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়নের তালুক গ্রামের কৃষক দুলাল মিয়া জানিয়েছেন, তিনি এবার ৪ হাজার বস্তা আলু হিমাগারে রেখেছিলেন, যেগুলোর মধ্যে ২ হাজার বস্তা বিক্রি হয়েছে। বর্তমান বাজারদরে তারা তাদের উৎপাদন ব্যয়ও উঠাতে পারছেন না।
“বিক্রিত আলুর প্রতি কেজিতে পাই মাত্র ১৫ টাকা। উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচ মিলিয়ে কেজিতে আমার খরচ প্রায় ২৩ টাকা — ফলে লোকসান হচ্ছে,”
কৃষকরা বলছেন, হিমাগার ভাড়া কেজিপ্রতি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা বাড়িয়েই তাদের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা অযোগ্য করে তুলছে। অনেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে লোকসান স্বীকার করে দ্রুত আলু বাজারে ছাড়ছেন, আর কেউ আবার বাজারে ছাড়ার আগেই ভাড়ার বোঝা সামলে রাখতে পারছেন না।
জেলা পর্যায়ের ধারণক্ষমতা ও বাস্তব সংরক্ষণ
রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যে ২০২৬ সালে জেলায় ৪২টি হিমাগারে মোট ধারণক্ষমতা ছিল ৪,৭০,৬০০ মেট্রিক টন, কিন্তু হিমাগারগুলোতে সংরক্ষণ করা হয়েছে মোট ৪,৮৮,৬৩৮ মেট্রিক টন। বলতে গেলে নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় অতিরিক্ত পরিমাণ আলু রাখা হয়েছে, যা হিমাগার ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করছে।
| বছর | হিমাগারের সংখ্যা | মোট ধারণক্ষমতা (মেট্রিক টন) | সংরক্ষিত আলু (মেট্রিক টন) |
|---|---|---|---|
| ২০২৬ | ৪২ | ৪,৭০,৬০০ | ৪,৮৮,৬৩৮ |
| ২০২৫ | ৪০ | ৪,৪১,১০০ | ৪,৬১,৭৪৮ |
অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছরও হিমাগারগুলো নির্ধারিত ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি পরিমাণ আলু সংরক্ষিত ছিল। এ বছরও একই প্রবণতা প্রকট হওয়ায় ভাড়া, নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সমস্যা আরো বেড়েছে বলে চাষিরা অভিযোগ করেছেন।
সরকারি উদ্যোগ ও কৃষকদের দাবি
আলুর দরপতন এবং হিমাগার ভাড়া কমানোর দাবিতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ১০ সদস্যের সুপারিশ প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক রয়েছেন রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. রমিজ আলম। সূত্রের খবর, কমিটি ইতোমধ্যে একটি সুপারিশ রেজুলেশন প্রস্তুত করেছে এবং তা শিগগিরই কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানা গেছে।
- কৃষকরা দাবি করছেন হিমাগার ভাড়া দ্রুত যৌক্তিক পর্যায়ে নামানো প্রয়োজন।
- সংরক্ষিত আলু বাজারে ছাড়ার আগেই সমন্বিত বাজার ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে হবে।
- জেলা ও মন্ত্রণালয়ের পর্যায়ে সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি বাড়বে।
কৃষি কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও প্রস্তাবিত সুপারিশ রেজুলেশনের বিস্তারিত তথ্য এখনও জেলার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো কর্তৃক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি। তবে কৃষক নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ বছরও তারা টানা দ্বিতীয় বছরের মতো লোকসান ভোগ করতে বাধ্য হতে পারেন।
অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত চাষিদের সমস্যা নয়—জেলার কৃষি অর্থনীতির উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বাজার মূল্য স্থিতিশীল করতে, হিমাগার ব্যবস্থাপনা এবং ভাড়া নির্ধারণে দ্রুত ও কার্যকর নীতিমালা জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।