জিআই (অবস্থানভিত্তিক স্বীকৃতি) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও জয়পুরহাট জেলার কচুরলতি—জনপ্রিয়ভাবে লতি—এখনও পর্যাপ্ত বাণিজ্যিক অবকাঠামো থেকে বঞ্চিত। জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী এই মৌসুমে জেলার পাঁচ উপজেলার মোট প্রায় ১২০৯ হেক্টর জমিতে কচুরলতি চাষ হয়; এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ হচ্ছে পাঁচবিবি উপজেলায়।
ফলন ভালো, বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি বেশি
কৃষকদের অভিযোগ: ভাল ফলন ও লাভের আশায় কচু আবাদ বাড়লেও বাজার ও পরিকাঠামোর দুর্বলতার কারণে তারা কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পাচ্ছেন না। বটতলী বাজারে অস্থায়ীভাবে বসে এমন একটি হাট; তা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে। সেখানে দূর-দূরান্তের পাইকাররা আসেন এবং প্রতিদিন ৪ থেকে ৫টি ট্রাক করে লতি নিয়ে চলে যান। চালানসংক্রান্ত এসব ক্রিয়াকলাপ সত্ত্বেও স্থায়ী পাইকারি বাজার, ট্যার্মিনাল বা কোল্ডস্টোরেজ না থাকায় উৎপাদিত পণ্য দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতা
পাটাবুকা গ্রামের চাষি হাফিজুর রহমান বলেন, এক বিঘা জমিতে কচু চাষে খরচ পড়ে ৪০–৫০ হাজার টাকা, আর বিক্রি হলে আয় দাঁড়ায় লক্ষাধিক টাকার কাছাকাছি। বর্তমান পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি লতি বিক্রি হচ্ছে ৫০–৫২ টাকা। তবে এই লাভের পরও অনেকেই ন্যায্য মূল্য ও স্থায়ী বাজার না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
“সারা দেশে চাহিদা আছে, রপ্তানিরও সম্ভাবনা, কিন্তু বাজার-পরিবহন ও সংরক্ষণের অবকাঠামো না থাকায় আমরা সুফল পাচ্ছি না,”
এমনটাই দাবি করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী মজিদুল হক। তিনি আরও জানান, হাট বসাতে বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীরা নিজেরাই স্থান ভাড়া করে শেড নিচ্ছেন, কিন্তু রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা, শৌচাগার বা কাদা-ময়লার জন্য পৃথক স্থান না থাকায় ব্যবসা করতে অসুবিধা হয়।
কৃষি বিভাগের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রস্তাব
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনজু আলম সরকার জানান, কচুরলতি চাষ অল্প খরচে বেশি লাভজনক হওয়ার কারণে আবাদ বাড়ছে। তিনি বললেন, জেলার পণ্যের আর্থিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে বেশ কিছু অবকাঠামোগত কাজ জরুরি—স্থায়ী বাজার ব্যাবস্থা, পাইকারদের জন্য বিশ্রামাগার, টয়লেট সুবিধা, শেড নির্মাণ, সরাসরি কৃষক থেকে ক্রয়-বিক্রয় এবং কোল্ড স্টোরেজ। প্রশাসন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যৌথ উদ্যোগে এগুলো বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় কৃষকদের আয় বাড়বে এবং রপ্তানি সম্ভাবনা বাস্তবে পরিণত হবে।
প্রযুক্তি ও সেবা যা দরকার
কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্টরা বলেন, কচুরলতি শুধু স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ রাখলে সম্ভাব্য মুনাফা সীমিত থাকবে। তাই তারা কয়েকটি পদক্ষেপের উল্লেখ করেছেন:
- কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও উন্নত জাতের চারা সরবরাহ
- সহজ শর্তে কৃষি ঋণ প্রদান
- সরকারি-বেসরকারি অংশিদারিত্বে স্থায়ী হাট ও কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ
- পাইকারদের জন্য অবকাঠামো: শেড, বিশ্রামাগার ও শৌচাগার
সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান
| বিবরণ | আণভিত্তিক তথ্য |
|---|---|
| মোট আবাদ (চলতি মৌসুম) | ১২০৯ হেক্টর |
| প্রধান আবাদ অঞ্চল | পাঁচবিবি উপজেলা |
| প্রতি কেজি পাইকারি দাম | ৫০–৫২ টাকা |
| প্রতি বিঘা খরচ (আনুমানিক) | ৪০,০০০–৫০,০০০ টাকা |
| হাট থেকে প্রতিদিন যাওয়া ট্রাক | ৪–৫টি |
স্থানীয় প্রভাব ও ভবিষ্যৎ পথ
স্থানীয়রা মনে করেন, কচুরলতির প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা রয়েছে। জিআই স্বীকৃতি এই চাহিদি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রসারিত করতে সাহায্য করেছে। তবে বাস্তবে রফতানি আর সুবিধাভোগী অভিগম্যতা পেতে হলে প্রক্রিয়াকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও শীতল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা বাধ্যতামূলক। বিষয়গুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে জিআই স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষিত সুবিধা কৃষকদের নাগালে পৌঁছাবে না—এটি সবাই স্বীকার করছেন।
জেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও বেসরকারি অংশীদারদের সমন্বয়ে যদি উপরের প্রস্তাবগুলো কার্যকর করা যায়, তবে কচুরলতি কৃষক ও এলাকার অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে এবং রপ্তানির মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।