রংপুর অঞ্চলে একক্ষেত্রে দু'তিন বছর নয়—সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহ ধরে দৈনন্দিন ভিত্তিতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিভ্রাটের প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে। ফলে নগরী ও আশপাশের জনজীবন একেবারে ভোগান্তিতে পড়েছে।
গৃহস্থালি কাজে ব্যাহত হচ্ছে সময়সূচি
কামাল কাছনা এলাকার গৃহিণী সেলিনা বেগম বলেন, “বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ নেই। সকালে সময়মতো খাবার রান্না করতে পারছি না। ছেলে স্কুলে নিয়ে যেতে না খেয়ে পাঠাতে হচ্ছে। ব্যবসায়ী স্বামীও না খেয়ে কাজে চলে যান।” আরেক গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, “এই গরমে শাশুড়িকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছি। বিদ্যুৎ থাকছে না, তাই সবসময় হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে হচ্ছে। লোডশেডিং আমাদের অনেক ভোগাচ্ছে।” এই অভিযোগগুলো শহরের নানা পাড়া ও আবাসিক এলাকায় গণজাগরণ হিসেবে সমান্তরালভাবে উঠে এসেছে।
ব্যবসা ও কর্মজীবনে ক্ষতি
কামারপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী রাসেক আলী বলেন, “আমার ব্যবসাই হচ্ছে বিদ্যুৎনির্ভর। দিনের বেশির ভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে আয়-রোজগার একেবারেই কমে গেছে। কর্মচারীদের বেতন দেব কী, আর দোকান ভাড়া কোথা থেকে দেব?” ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা জানান, ফ্রিজ, পাম্প, ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকায় মালপত্র নষ্ট হচ্ছে, কাজের সময় খাটতি দেখা দিচ্ছে এবং প্রতিদিন আয় কমে গেছে।
স্বাস্থ্যসেবায় ব্যাঘাত
হাসপাতাল ও ক্লিনিকে লোডশেডিংয়ের ফলে চিকিৎসা সেবাও ব্যাহত হচ্ছে—অ্যাম্বুলেন্স, লাইফ-সাপোর্ট যন্ত্রপাতি, ওষুধ সংরক্ষণে ফ্রিজের কার্যকারিতা প্রভৃতি জড়িত। সূত্রে জানানো হয়েছে, রোগীদের উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে চিকিৎসক, নার্স ও রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা চরম সমস্যায় পড়ছেন।
চাকরিজীবী ও রোজগারপ্রাপ্তদের দুর্ভোগ
চাকরিজীবী মাসুদুর রহমান বলেন, “সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে যেতে হয়। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না, যার ফলে অফিসের কাজও করতে অনেক সমস্যা হচ্ছে।” ফলে ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতা ও প্রতিষ্ঠানগত সময়ানুবর্তিতাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এবং ফলস্বরূপ অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে।
স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের উদ্বেগ
নগরীর সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) শাখার সভাপতি উল্লেখ করেন, লোডশেডিংয়ের কারণে রংপুরের প্রতিটি স্তরের মানুষ নাজেহাল অবস্থায় আছে এবং দ্রুত সমাধান না করা হলে নগরীর অবস্থা আরও অবনতি হবে।
“লোডশেডিং শুধু রংপুরেই নয়, এ সমস্যা সারাদেশব্যাপী। চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন কম হওয়ায় এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে খুব দ্রুত লোডশেডিং সমস্যা সমাধানে আমরা কাজ করছি।” — নেসকো রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম মণ্ডল
কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ও জনদাবি
নেসকো রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম মণ্ডল সমস্যাটিকে জাতীয় উৎপাদন-চাহিদার অনুপাতের ফল হিসেবে দেখিয়েছেন এবং দ্রুত সমাধানের কাজ চলছে বলে জানান। তবে স্থানীয়রা চরম তাপ ও বিদ্যুৎহীনতার মধ্যে পড়ে যে বহুমুখী ক্ষতি স্থান করছে—তার তাত্ক্ষণিক ও কার্যকর সমাধানের দাবি তুলেছেন।
প্রভাবের সংক্ষিপ্ত চিত্র
- প্রতিদিন বিদ্যুৎহীনতার সময়: স্থানীয়রা বলছেন ১০–১২ ঘণ্টা
- প্রভাবিত সেক্টর: গৃহস্থালি কাজ, ছোটকারখানা, হাসপাতাল/ক্লিনিক, ব্যবসা ও অফিসচলাচল
- জনগণের মূল অভিযোগ: খাদ্য প্রস্তুতি ব্যাহত, ঔষধ সংরক্ষণ ঝুঁকিতে, আয় হ্রাস ও মানসিক দৈহিক ক্লান্তি
| ক্ষেত্র | প্রভাব |
|---|---|
| গৃহস্থালি | রান্না-বিচ্ছিন্নতা, বৃদ্ধ-শিশুদের কষ্ট |
| ব্যবসা | আয় কমে যাওয়া, মালপত্র নষ্ট হওয়া |
| স্বাস্থ্য | চিকিৎসা কার্যক্রমে বিঘ্ন, ওষুধ সংরক্ষণ ঝুঁকি |
পরবর্তী পদক্ষেপ
কর্তৃপক্ষ উৎপাদন ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষার কথা বললেও স্থানীয়দের জন্য জরুরি কর্মসূচি দরকার—জলবায়ু-অনুকূল সময়ে তাদের স্বাস্থ্য ও খাদ্য সুরক্ষার নিশ্চিতকরণ, হাসপাতাল ও জরুরি সেবায় জেনারেটর ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহায়তার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। এছাড়া জনসাধারণকে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ও জরুরি অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি।
রংপুর নগরী ও আশপাশের এলাকার মানুষ ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন; নেসকোর আশ্বাসের মধ্যেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—আপেক্ষিক স্বল্পমেয়াদে এবং স্থায়ী সমাধানে কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।