বান্দরবান সদর হাসপাতালে সোমবার অনুষ্ঠিত এক পাঠক্রম সমাপ্তি অনুষ্ঠানে বান্দরবানের প্রান্তিক এলাকার ১৯ নারীকে সেনাবাহিনী থেকে স্বাস্থ্যসেবা প্রশিক্ষণের সনদ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রদান করা হয়েছে। দুই সপ্তাহব্যাপী এই প্রশিক্ষণটি গর্ভবতী নারী, প্রসূতি মা ও নবজাতুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রশিক্ষণের ধরন ও উদ্দেশ্য
প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদেরকে গর্ভাবস্থার ঝুঁকি ও বিপদচিহ্ন শনাক্তকরণ, প্রসবকালীন প্রাথমিক সহায়তা, নবজাতকের প্রাথমিক পরিচর্যা, বুকের দুধ খাওয়ানোর কৌশল, টিকাদান, সিপিআর ও ক্যানুলা প্রয়োগ, স্বাস্থ্য কাউনসেলিং, পরিবার পরিকল্পনা ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত রেফার্ড করার পদ্ধতি বিষয়ে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পাঠ দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল প্রত্যন্ত এলাকায় বাস করা এমন নারীদের মধ্যে প্রাথমিক ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের সক্ষমতা তৈরি করা, যাতে সমস্যার সময়ে দ্রুত এবং সঠিক প্রতিকার নিশ্চিত করা যায়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ও সরঞ্জাম বিতরণ
বান্দরবানের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আরিফুল ইসলাম প্রধান অতিথি হিসেবে সকালেই প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে সনদপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম তুলে দেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা: শাহীন হোসেন চৌধুরী, সেনাবাহিনীর সেভেন ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরফরাজ হোসেন এবং জেলা হাসপাতালের অন্যান্য চিকিৎসকরা।
উপকরণ বিতরণ ও পাঠ্য কার্যক্রম সম্পর্কে উপস্থিত চিকিৎসকরা বলেছিলেন, প্রশিক্ষণে দেয়া সরঞ্জাম ও জ্ঞান প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত শুশ্রুষা প্রদানে সহায়ক হবে। তারা আশা প্রকাশ করেন এই কাজ স্থানীয় মা ও শিশুর মৃত্যু ও জটিলতা কমাতে ভূমিকা রাখবে।
প্রশিক্ষণের কাঠামো ও বিষয়বস্তুর সারাংশ
- সময়সীমা: দুই সপ্তাহ
- অংশগ্রহণকারী: ১৯ নারী
- প্রধান বিষয়: গর্ভাবস্থার ঝুঁকি শনাক্তকরণ, প্রাথিমিক প্রসব সহায়তা, নবজাতুর পরিচর্যা
| প্রশিক্ষণের বিষয় | সূত্র/উপাদান |
|---|---|
| ঝুঁকি ও বিপদচিহ্ন শনাক্তকরণ | তত্ত্ব ও অনুশীলন |
| প্রসবকালীন প্রাথমিক সেবা | প্রায়োগিক কৌশল |
| নবজাতকের পরিচর্যা ও বুকের দুধ খাওয়ানো | ডেমোনস্ট্রেশন |
স্থানীয় প্রেক্ষাপট ও প্রয়োগযোগ্যতা
বান্দরবান জেলার অনেক অংশ প্রত্যন্ত ও দুর্গম। এইসব এলাকায় প্রাত্যহিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব, দূরের জন্য হাসপাতাল পৌঁছানো আর চিকিৎসা কর্মীর সীমিত উপস্থিতি থাকে। ফলে গর্ভাবস্থা ও প্রসবকালীন জটিলতা দ্রুত মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য ছিল এমন সময় স্থানীয় স্তরে প্রাথমিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে গুরুতর অবস্থা রোধ করা। প্রশিক্ষিত নারীরা স্থানীয় স্তরে আগাম সতর্কতা ও প্রাথমিক সেবা প্রদানে দক্ষ হলে রোগীকে দ্রুত রেফার করার মাধ্যমেও জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে।
প্রশিক্ষণার্থীরা বলছেন, তারা এই সেবা গ্রামে ফিরলে দ্রুত প্রয়োগ করতে পারবেন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নামমাত্র চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার করে প্রাথমিক সহায়তা দিতে সক্ষম হবেন। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে খবরদারি, কাউন্সেলিং ও পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত জ্ঞানও বাড়ানো হয়েছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে মা–শিশুর স্বাস্থ্যে ভালো প্রভাব ফেলবে।
চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজনীয়তা
এ ধরনের উদ্যোগ ফলপ্রসূ হতে গেলে নিয়মিত অবকাঠামো সুবিধা, পর্যাপ্ত রেফারাল ব্যবস্থা ও প্রাদেশিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ পেলেও প্রয়োজনে দ্রুত হাসপাতাল বা বিশেষ চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো গেলে তবেই সঠিক ফল পাওয়া যাবে। উপস্থিত চিকিৎসকরা বলেন, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগকে এই কাজে ধারাবাহিক সহায়তা প্রদান করতে হবে।
এই প্রশিক্ষণ স্থানীয় স্তরে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবায় একটি ক্ষুদ্র কিন্তু যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রত্যন্ত সীমান্তবর্তী জনপদে যেখানে প্রতিটি মিনিট মূল্যবান, সেখানে তাদের হাতে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও সরঞ্জাম থাকলে প্রাণ রক্ষা সম্ভব।
বান্দরবান থেকে উম্মে হাবিবা