কুষ্টিয়ার কুমারখালির একটি দুর্গম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ে স্থানীয়ভাবে তীব্র অভিযোগ উঠেছে। চরসাদিপুর ইউনিয়নের ৮৩ নম্বর চর চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-এ বর্তমানভাবে পাঠদানে গলদ, অবৈধ কৌচিং ব্যবসা ও গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ছাত্র বা পরিবারের ওপর চাপভিত্তিক আচরণের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখবার জন্য শিক্ষা বিভাগ বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
বিদ্যালয়ের কাঠামো ও অভিযোগের সারসংক্ষেপ
১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ওই বিদ্যালয়ে বর্তমানে ২৯৫ জন শিক্ষার্থী পঠিত। সুযোগ-ইতিমধ্যে বিদ্যালয়ে ছয়টি শিক্ষকপদ থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে অফিসিয়ালি কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুইজন—ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল হামিদ ও সহকারী শিক্ষক গোলাপী পারভীন। স্থানীয়রা জানায়, ২০১৪ সাল থেকে এই দম্পতি একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘসময় ধরে নিয়োজিত থাকলেও নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার বদলে তারা অন্যদের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।
কী অভিযোগ উঠেছে?
- শিক্ষক সংকটের অজুহাতে স্কুলে দুই জন—রিয়াদ হোসেন ও মো. আল আমিন—নামক ব্যক্তিকে পাঠদানের দায়িত্বে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ।
- এই ব্যক্তিদের মাধ্যমে মূলত প্রাইভেট কোচিং পরিচালিত হয় এবং মাসিক ৩০০ টাকা ফি ও যাতায়াতের জন্য অতিরিক্ত ২০ টাকা নেওয়া হত বলে অভিভাবকরা অভিযোগ করেন।
- সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিদ্যালয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর একটি ঘটনার শুরুতে পরীক্ষা চলাকালীন এক শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়; পরে প্রায় ৩০ মিনিট পর তাকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
- ভিডিও ধারণের অভিযোগে ওই শিক্ষার্থীর বড় ভাইয়ের ওপর বিকেলে সড়কে সহিংস আচরণ চালিয়ে তার মোবাইল ভেঙে ফেলা হয় বলে ভুক্তভোগী পরিবার দাবি করেছে।
- সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের পক্ষ থেকে পরিবারটির ওপর চাপ সৃষ্টি করারও অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবাদ, কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ ও তদন্ত
বিদ্যালয়ের এসব অনিয়মের কথা স্থানীয় গণমাধ্যমে আলোচনায় আসার পর শিক্ষা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নজরে এনে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। উপজেলা ও জেলার সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তারা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছেন বলে জানা গেছে।
“সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের পক্ষ থেকে পরিবারটির ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে”
অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতনরা দ্রুত তদন্ত করে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছেন, যাতে শিশুদের শিক্ষা ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। তাদের বক্তব্য—বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা স্বচ্ছ না হলে তা সরাসরি শিক্ষার্থীর অধিকার ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিদ্যালয়ের খুঁটিনাটি তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| বিদ্যালয়ের নাম | ৮৩ নং চর চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় |
| প্রতিষ্ঠার বছর | ১৯৭৩ |
| নিবন্ধিত শিক্ষার্থী | ২৯৫ জন |
| নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকপদ | ৬টি (বর্তমানে কার্যত ২ জন কর্মরত) |
| অভিযোগকৃত অনৈতিক ফি | মাসিক ৩০০ টাকা + যাতায়াত ২০ টাকা (অভিযোগ অনুযায়ী) |
অভিযোগ প্রমাণিত হলে শিক্ষা আইনে ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। অপরদিকে, অভিযোগ অস্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল হামিদ সংবাদকর্মীদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানানোর কথা বলা হলেও তাঁর বক্তব্যের পূর্ণ বিবরণ এই প্রতিবেদনের প্রাপ্ত সূত্রে নেই।
স্থানীয় অভিভাবকরা জানান, নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত হওয়ার আগে তারা তাদের সন্তানকে পাঠাতে অনিশ্চিত; একই সঙ্গে দাবী করেছেন—শিক্ষকদের অনুপস্থিতি ও কোচিং-ভিত্তিক বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা বন্ধ করে সরকারি পাঠ্যক্রমে মনোনিবেশ করা হোক।
এ ঘটনার প্রসঙ্গে শিক্ষা বিভাগ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রতিক্রিয়া পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পেলেই পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে শিক্ষা অফিস আঞ্চলিকভাবে সিদ্ধান্ত জানাবে বলে আশাlocal করা হচ্ছে।
প্রেক্ষাপট: দুর্গম এলাকায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ না থাকলে বেসরকারিভাবে কোচিংয়ের আগ্রাসন বাড়ে; তা দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষার সুযোগে ব্যাঘাত ঘটায়—স্থানীয় শিক্ষা-বিষয়ক বিরোধ এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের এই সিরিজ কুমারখালির মতো উপজেলায় বারবার দেখা যায়।