সংকটের পরিমাপ
কুষ্টিয়ায় ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি কুটির পণ্য উৎপাদন এখন সংকটাপন্ন। জেলার বাঁশ-বোত শিল্পের ওপর নির্ভর প্রায় ৫০০ পরিবার দীর্ঘদিন ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসলেও কাঁচামালের অভাবে өндірন কার্যক্রম সংকুচিত হচ্ছে এবং অনেক কারিগর বাধ্য হয়ে এই পৈতৃক পেশা ছেড়ে দিচ্ছে।
স্থায়ী পরিকল্পনা ও পরিচর্যার অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পতিত জমিতে বাঁশ চাষের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সুষ্ঠু আয়োজনে তা বাস্তবে রূপান্তরিত করা হয়নি। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে বাঁশের অপরিকল্পিত কাটাছেঁড়া—বিশেষত ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য মুতা কেটে ফেলার প্রবণতা—বাঁশঝাড়ে ধ্বংস ও পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি বাড়ানোর কারণ হয়েছে।
কারিগরদের উদ্বেগ ও বিসিকের উদ্যোগ
জেলা এলাকায় কুটির শিল্পের কারিগররা জানাচ্ছেন, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল না থাকায় বাজারজাত পণ্যে সরবরাহ কমে গেছে এবং ব্যবসা ধাক্কায় পড়েছে। তাঁরা বলেন, আধুনিক ডিজাইন ও নতুন বাজারজাত কৌশ্য না জানায় নতুন ধরনের পণ্য তৈরিতে পিছিয়ে পড়েছেন।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) জেলা অফিস মাঠে কাজ শুরু করেছে। বিসিক কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ী দাসপাড়া, মিরপুর উপজেলার আবুরি দাসপাড়া, মালিহাদ দাসপাড়া এবং খন্দকবাড়িয়া এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে মোট ১০২ জন বাঁশ ও বেত পণ্য উৎপাদনকারী কুটির শিল্প উদ্যোক্তা চিহ্নিত করা হয়েছে।
| অঞ্চল | নোট |
|---|---|
| পাটিকাবাড়ী দাসপাড়া (সদর) | স্থল পরিদর্শন অন্তর্ভুক্ত |
| আবুরি দাসপাড়া (মিরপুর) | স্থানীয় কারিগর বসবাস |
| মালিহাদ দাসপাড়া | কাঠামো ও উৎপাদন চাহিদা খতিয়ে দেখা হয়েছে |
| খন্দকবাড়িয়া | কলা ও বেত উৎপাদন বিবেচ্য |
প্রভাবিত পণ্য ও জাত
এই অঞ্চলের কারিগররা বিভিন্ন ধরণের গৃহস্থালি ও শৌখিন সামগ্রী তৈরি করে থাকেন—কুলা, চালনি, ডোল, খালই, পলো, চাটাই, ডালি, দোলনা, চেয়ার, ফুলের টব, শোপিস ও অন্যান্য আসবাবপত্র। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বাঁশের বিভিন্ন জাতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: মৃত্তিকা, বরাক, মুলি, তল্লা, মাকলা, বারিয়ানা, নল, ভুদুম, রেঙ্গুন ও কালি।
“আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু আধুনিক ডিজাইন জানা না থাকায় বাজারে নতুন ধরনের পণ্য আনতে পারছি না।”
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার দিক
চাহিদা বাড়লেও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও পরিকল্পিত চাষের অভাবে স্থানীয় উৎপাদন তা পূরণ করতে পারছে না। ফলশ্রুতিতে কুটির শিল্পে কাজের সুযোগ কমছে এবং কারিগরদের আয়ের ধরণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। তাছাড়া ইটভাটার জন্য নির্বিচারে বাঁশ কাটার কারণে স্থানীয় বাঁশঝাড় ধ্বংস ও পরিবেশগত বিপর্যয়ও বাড়ছে।
বিসিকের মাঠ কার্যক্রমে যদি প্রশিক্ষণ, আধুনিক ডিজাইন ও চাষ-পরিচর্যা সংক্রান্ত সহায়তা যোগ হয়, তাহলে কুষ্টিয়ার বাঁশ ও বেত শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা যেতে পারে—এমনটাই মনে করেন স্থানীয় কারিগর ও সংশ্লিষ্টরা। তাঁরা সরকারি সহযোগিতা ও প্রবেশযোগ্য বাজার কাঠামো চাইছেন, যাতে টেকসইভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে এবং কুটির শিল্প পুনরায় প্রাণ পায়।
- প্রধান সমস্যা: পরিকল্পনার অভাব ও কাঁচামালের সঙ্কট
- পর্যবেক্ষণ: ১০২ জন কারিগর চিহ্নিত; ~৫০০ পরিবার নির্ভরশীল
- সমাধান সম্ভাবনা: বিসিকের উদ্যোগে প্রশিক্ষণ, চাষ পরিচর্যা ও ডিজাইন সহায়তা
স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো কিভাবে এবং কী সময়ক্রমে এই উদ্যোগগুলো কার্যকর করবে, তা আগামী সময়ে বড় প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-বোত শিল্পকে ধরে রাখতে হলে কাঁচামাল উৎপাদন, পরিবেশসংরক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা—এই তিনটি মিলেই কার্যকর সমাধান সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।