বান্দরবান প্রেসক্লাবের সামনে সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেল ৩টায় রাজবিলা ইউনিয়নের শিলক খাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি ও এলাকাবাসী মিলিয়ে মানববন্ধন করে। এসময় উপস্থিত ছিলেন রাজবিলা ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামের শতাধিক নারী-পুরুষ। তারা প্রস্তাবিত বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলন স্থগিত রেখে এলাকায় পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়ার দাবি জানান।
স্থানীয় আশঙ্কা—রাবার ড্যাম ও কৃষিজমির ক্ষতি
মানববন্ধনে বক্তারা জানান, রাবার ড্যামের মাত্র ৩০০ ফুট দূরত্বে বালু উত্তোলন শুরু হলে ড্যামের স্থিতিশীলতা ও আশপাশের কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তারা স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে শিলক খালের ব্রিজঘাটা এলাকায় একটি সেতু ভেঙে গেলে বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কে ১৫ দিনের বেশি যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
জীববৈচিত্র্য, সেচ ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর প্রভাব
বক্তারা বলেন, শিলক খাল এলাকার ওপর নির্ভর করে স্থানীয় কৃষকরা সেচ নিশ্চিত করে জমিতে ফসল ফলান। খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যহত হলে কৃষি উৎপাদন, স্থানীয় মানুষের জীবিকা, জলজ প্রাণী এবং সমগ্র জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে, যা সুপারিশযোগ্য নয়।
দাবি-চাওয়াসমূহ
মানববন্ধনে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। বক্তারা জোর দেন যে উন্নয়ন বিরোধী নন, তবে যেকোনো উন্নয়ন কার্যক্রম হতে হবে আইনসম্মত, পরিবেশসম্মত ও জনস্বার্থ রক্ষাকারী। তারা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছে জনস্বার্থ ও পরিবেশ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের আর্জি জানান।
- প্রস্তাবিত বালুমহালের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ রাখা।
- পরিবেশ, কৃষি, পানি প্রবাহ, রাবার ড্যাম ও জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন না হওয়া পর্যন্ত বালু উত্তোলন স্থগিত রাখা।
- স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট দফতরের মতামত নিয়ে পুনরায় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
- জনস্বার্থ, পরিবেশ ও অবকাঠামোর ক্ষতির ঝুঁকি বিবেচনায় প্রস্তাবিত বালুমহালের ইজারা বাতিল করে এলাকাটি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া।
- এছাড়া একাধিক বক্তা অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করার আবেদন জানান।
| বিষয় | স্থানীয় উদ্বেগ |
|---|---|
| রাবার ড্যাম | বালু উত্তোলনের ফলে ড্যামের স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা |
| কৃষি | সেচ সমস্যায় পড়ে ফসল উৎপাদনে ঘাটতি |
| অবকাঠামো | সেতু ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পরিবহন ব্যাহত হওয়া |
কেন তাৎপর্যপূর্ণ?
বান্দরবানের মতো পাহাড়ি ও উপত্যকাভিত্তিক এলাকায় নদী-খাল ও জলাধার ধরে রাখতে না পারলে সরাসরি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে। শিলক খাল এলাকার পানি ব্যবস্থাপনা হলে কৃষকের সেচবিহীন ফসলায়ন ও স্থানীয় জীবিকায় বিরূপ বিচার্য সৃষ্টি হতে পারে—এমন উদ্বেগ বক্তারা প্রকাশ করেন।
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন উসাইনু তালুকদার (শিলক খাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সভাপতি), উথিচিং মারমা ও উখ্যাই মারমা। তারা সবাই প্রশাসন এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করে বিষয়টি সমাধানের আহ্বান জানান।
স্থানীয়রা বলছেন তারা উন্নয়ন ঘটাতে চায়, তবে সেটি হবে পরিবেশসম্মত ও জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষাকারী—না হলে পরিবেশগত ক্ষতি ও জনদূর্ভোগ অনিবার্য। মানববন্ধন থেকে সংগৃহীত এই দাবিগুলো দ্রুতভাবে প্রশাসনের সমন্বিত মূল্যায়ন ও পদক্ষেপের দাবি তুলেছে।
তারা অনুরোধ করেন সংশ্লিষ্ট দফতর ও জনপ্রতিনিধিদের সহিত পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করে খালের ওপর প্রস্তাবিত বালু উত্তোলনের সম্ভাব্য প্রভাব যাচাই করে তা জনস্বার্থের আলোকে নিয়ন্ত্রণ কিংবা বাতিল করা হোক।
উপস্থিত মানুষদের মধ্যে অনেকে ভবিষ্যতে যদি খাল-জলবিভাগ সংরক্ষণ করা যায় তাহলেই এলাকার টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে বলে মনে করেন।
রিপোর্ট: উম্মে হাবিবা, বান্দরবান প্রতিনিধি, WE NEWS