রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারে চারজনকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস-কে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ তিন সদস্যের একটি দল রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটকে উপস্থিত হয়ে দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। মামলা তদন্তে নতুন পাওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে এসব তথ্যের সামঞ্জস্য আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে, জানিয়েছে ডিবি সূত্র।
আদালতের নির্দেশনা ও রিমান্ডের সীমা
রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক রফিকুল ইসলাম সোমবার জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন। যদিও তিন দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছিল, আদালত আগামী তিন দিনের মধ্যে যেকোনো দুই দিন প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন। শুনানি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয় এবং আসামিদের পক্ষে লিগ্যাল এইডের আইনজীবীরা অংশ নেন।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবির উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়ার পর রিমান্ডে নেওয়ার সরাসরি আইনগত সুযোগ নেই। তবে তদন্তে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ এবং নতুন তথ্য পাওয়ার প্রেক্ষিতে আদালত জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুরু্পম অনুমতি দিয়েছেন।
“তদন্ত তো চলছেই। আমরা বসে নেই। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের পরিধি
ডিবি জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে মূলত হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত নতুন সূত্রগুলোর প্রমাণ সন্ধান, আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে সামঞ্জস্য পরীক্ষা এবং ঘটনার ঘটপটুতা নির্ধারণ করা হবে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ডিবির পুলিশ পরিদর্শক জিন্নাত আলী জেলগেটে প্রবেশ করে বিকেল তিনটার দিকে বের হন।
তদন্ত সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো: আসামিদের জবানবন্দিতে হত্যার আগে মাদক সেবনের কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু কর্মকর্তারা জানায় ডোপ টেস্টে মাদকের আলামত পাওয়া যায়নি—এটি তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ঘটনার পটভূমি
রংপুর নগরীর দাসপাড়া এলাকায় গত ২২ আগস্ট রাতে একই বাড়িতে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকে হত্যা করা হয়। ঘটনার দিন রাতে সন্দেহভাজন হিসেবে মুগ্ধ দাস (কানু দাসের ছেলে) ও সিদ্ধার্থ দাস (বিনয় দাসের ছেলে)কে আটক করে পুলিশ। পরে গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর করা মামলার পর הרשמית গ্রেপ্তার কার্যক্রম নিশ্চিত করা হয়।
নিহতরা হলেন: গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), আগামী চক্রবর্তী পার্থী (২৪) ও আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)। গণপতি ছিলেন রংপুর জেলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক; ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি অবসরে যান এবং পরবর্তীতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা প্রদান করতেন।
- জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ: তদন্তকারীর নেতৃত্বে ডিবি দল
- আদালত অনুমতি: তিন দিনের মধ্যে যেকোনো দুই দিন, প্রতিদিন তিন ঘণ্টা
- মাদকগত দাবি বনাম ডোপটেস্ট: জবানবন্দিতে ছিল মাদক সেবনের উল্লেখ; ডোপটেস্টে আলামত পাওয়া যায়নি
তদন্তের সময়রেখা (সংক্ষিপ্ত)
| তারিখ/ঘটনা | বর্ণনা |
|---|---|
| ২২ আগস্ট | দাসপাড়া এলাকার বাড়িতে গণপতি ও পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা |
| ঘটনার রাত | সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করা হয় |
| সোমবার | আদালতে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চাওয়া হয় |
| মঙ্গলবার (আজ) | তদন্তকারী দল জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন করে |
তদন্তকারীরা বলছেন, মামলাটি 'লোমহর্ষক' এবং রহস্য উদঘাটনে তারা পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কাজ চালাচ্ছেন। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, তারা বিশ্বাস করেন মামলার রহস্য উদঘাটনের দোরগোড়ায় পৌঁছেছেন—তবে তদন্তের ফলাফল আদালত ও দায়িত্বরত সংস্থাগুলোই নির্ধারণ করবে।
এই ঘটনায় রংপুরবাসী উদ্বিগ্ন; একটি সম্মিলিত পরিবার হত্যাকাণ্ড সমাজে নিরাপত্তা, অপরাধপ্রবণতা ও আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। স্থানীয়রা তদন্তে দ্রুততার সঙ্গে ন্যায়বিচারের দাবি করছেন। ডিবি ও তদন্তকারীরা জানান, প্রাপ্ত প্রমাণ ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে।
তদন্ত চলছে; আদালত কর্তৃক নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে জেলগেটে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।