নারায়াণগঞ্জের দেবিদ্বার উপজেলায় ভাড়া বাসায় গ্যাস লিকেজ থেকে সৃষ্ট আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন কুমিল্লার দেবিদ্বারের এক দম্পতি—প্রথমে স্বামী খোকন সরকার (৫৪) এবং তাঁর স্ত্রী ফজিলত বেগম (৪০)। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু ও দ্রুত পরপতরের দাফন-সমগ্র ঘটনা নিয়ে উজানীকান্দি ও উজানীজোড়া গ্রামে নেমেছে গভীর শোক।
ঘটনার সারসংক্ষেপ ও চিকিৎসালয় পরিস্থিতি
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার রাতে নারায়াণগঞ্জ শহরের বন্দরে মুরাদপুর এলাকায় ভাড়া বাসার একটি কক্ষে গ্যাসের কয়েল ধরার সময় গ্যাস লিকেজ থেকে হঠাৎ আগুন ধরে যায়। ওই আগুনে গুরুতর দগ্ধ হন খোকন সরকার ও তাঁর স্ত্রী ফজিলত বেগম। উদ্ধার করে দ্রুত তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
দম্পতিকে ভর্তি করা হয়েছিল জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট-এ। সেখানে চার দিন আইসিইউতে থাকার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টায় প্রথমে মারা যান খোকন সরকার। তাঁর মৃত্যুর ছয় ঘন্টার মধ্যেই—বুধবার বিকেল ৪টায়—চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ফজিলত বেগম।
গ্রাম, শেষকৃত্য ও পারিবারিক চিত্র
খোকনের মরদেহ বুধবার সকালে পরিবারের সদস্যরা উজানীকান্দি গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। সকাল ১০টায় স্থানীয় জানাজা শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। স্ত্রী ফজিলত বেগমের মরদেহ রাতেই উজানীজোড়া গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে যায় এবং বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় জানাজা শেষে নিজস্ব কবরের পাশে তাঁকেও দাফন করা হয়।
দম্পতির প্রতি মুহূর্তের শোকে দুই গ্রাম ভারি হয়ে উঠে। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতরা দায়ভারের মন নিয়ে নিহত দম্পতির পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ায়।
পরিবার ও কাজকর্ম
নিহত খোকন সরকার দেবিদ্বার উপজেলার গুনাইঘর দক্ষিণ ইউনিয়নের উজানীকান্দি গ্রামের মৃত আব্দুল গফুরের ছেলে। তাঁর স্ত্রী ফজিলত বেগম একই ইউনিয়নের উজানীজোড়া গ্রামের নানু মিয়া খন্দকারের মেয়ে। উভয়েই নারায়াণগঞ্জের মদনপুর এলাকার জাহীন গার্মেন্টসে কর্মরত ছিলেন। তাদের দুই সন্তান—ইউসুফ সরকার এবং মেয়ে খাদিজা আক্তার।
“আমরা দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতাম। ঘটনার সময় আমি ও আমার ভাই গ্রামে ছিলাম। শুক্রবার রাতে ফোনে জানতে পারি, আব্বা-আম্মা দুজনই আগুনে দগ্ধ হয়েছেন। পরে ঢাকা মেডিক্যালে গিয়ে জানতে পারি, তাঁরা দুজনই আইসিইউতে ভর্তি। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আব্বা এবং পরদিন বুধবার বিকেলে আম্মাও মারা যান।” — খাদিজা আক্তার, নিহতদের মেয়ে
স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও সহায়তা
দেবিদ্বার উপজেলা প্রশাসন নিহত পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অশোক বিক্রম চাকমা নিহতদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের হাতে নগদ আর্থিক সহায়তা তুলে দেন। প্রশাসনিক পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও পারিবারিক পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহায়তার প্রতিশ্রুতি জানানো হয়েছে বলে পরিবার সূত্রে খবর।
ঘটনার সময়সূচি (টানিকি)
- শুক্রবার (রাত) — ভাড়া বাসায় গ্যাস লিকেজ থেকে আগুন ধরে যায়; দম্পতি গুরুতর দগ্ধ হন।
- রাগডে — উভয়কে উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।
- মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা — খোকন সরকারের মৃত্যু।
- বুধবার সকাল ১০টা — খোকনের জানাজা ও দাফন (উজানীকান্দি)।
- বুধবার বিকেল ৪টা — ফজিলত বেগমের মৃত্যু।
- বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা — ফজিলত বেগমের জানাজা ও দাফন (উজানীজোড়া), স্বামীর কবরের পাশে।
| নাম | বয়স | সম্পর্ক | কর্মস্থল |
|---|---|---|---|
| খোকন সরকার | ৫৪ | স্বামী | জাহীন গার্মেন্টস, মদনপুর, নারায়াণগঞ্জ |
| ফজিলত বেগম | ৪০ | স্ত্রী | জাহীন গার্মেন্টস, মদনপুর, নারায়াণগঞ্জ |
স্থানীয় প্রভাব ও পরবর্তী ভাবনা
এক পরিবারের দুই সদস্যের দ্রুত মৃত্যু গ্রাম দুটি—উজানীকান্দি ও উজানীজোড়া—কে মানসিকভাবে ব্যাপকভাবে ব্যবসত করেছে। পরিবারের দুই কিশোর/কিশোরী সন্তান এখন আত্মীয়-পরিজনদের কাছে নির্ভরশীল। স্থানীয় সমাজে ভাড়া বাসায় থাকা শ্রমজীবী দম্পতিদের স্থায়ী নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে আর্থিক নিরাপত্তা এবং গ্যাস ব্যবহারে সতর্কতা বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
বাস্তবায়িত হওয়া জরুরী পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে—গ্যাস সিলিন্ডার ও লাইন নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভাড়াবাসার বৈদ্যুতিক ও রান্না-ব্যবস্থার নিরাপত্তা নির্দেশনা এবং শ্রমজীবী পরিবারগুলোর জন্য স্থানীয় নিরাপত্তা জাগরণ।
এই দুঃখজনক ঘটনায় নিহতদের আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের শোক ও উদ্বেগ কমাতে স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজকর্মীদের করণীয় থাকবে। বর্তমান সময়ে পরিবারকে আর্থিক ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আগামিতে এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি—এটাই স্থানীয়দের চাওয়া।