নারায়ণগঞ্জ নগরীর দুই নম্বর রেলগেট সংলগ্ন মুক্তিযুদ্ধ স্মারক ভাস্কর্য ‘‘ফিরে দেখা ৭১’’ অপসারণ বা পুনঃস্থাপনের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বুধবার (১২ আগস্ট) তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে বিষয়টি স্থান করে নেয় যখন সড়ক নিরাপত্তা ও যানজট নিরসন নিয়ে আলোচনা চলে।
বক্তাদের মত ও দায়বদ্ধতার আর্জি
সেমিনারে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, ‘‘চাষাঢ়ার পরে নগরীর দুই নম্বর রেলগেট একটি কেন্দ্র। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের একটি ভাস্কর্য থাকুক, সেটি আমরা চাই।’’ তাঁর বক্তব্যে স্মৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি সংবেদন প্রকাশ পায়।
অন্যদিকে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেন, ওই স্থলটি রাস্তার জন্য অনেক অসুবিধা সৃষ্টি করছে এবং বহু দোকানদার জায়গাটি দখল করে আছে। তাঁর বক্তব্যে সড়ক নিরাপত্তা ও জনসাধারণের চলাচলের ওপর প্রাধান্য দেওয়া স্পষ্ট হচ্ছে।
“ওইটা রাস্তার জন্য অনেক অসুবিধা। এবং অনেক দোকানদার জায়গাটি দখল করে রাখছে।” — আবু আল ইউসুফ খান টিপু
প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, ভাস্কর্যটি কবে স্থাপন করা হয়েছে তা বিবেচনা করে সরাসরি অপসারণ না করে প্রতিস্থাপনের প্রস্তাবই যুক্তিসঙ্গত। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘‘এটি গেলে কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চলে যাবে?’’
প্রতিস্থাপন বনাম অপসারণ: অবস্থানের স্পষ্টতা
বীর মুক্তিযোদ্ধা নুর আলম মিয়া বলেন, ‘‘প্রতিস্থাপনের বিষয়ে আপনাদের আলাপ-আলোচনা নয়, নাগরিক স্বার্থে যা করার, সেটি করবেন।’’ তাঁর বক্তব্যে জনসাধারণের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি মনে করা যায়।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, দুই নম্বর রেলগেটে ভাস্কর্য সরিয়ে অন্যত্র সুষ্ঠুভাবে পুনঃস্থাপন করার চেষ্টা চালানো হবে। তিনি জানান, ভবিষ্যতে দুই নম্বর গেটের জায়গা বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে; এর জন্য রেলের জায়গায় থাকা কিছু নির্মাণ ভাঙার কথা বলা হয়েছে যাতে সেখানে ভাস্কর্য সুন্দরভাবে স্থাপন করা যায়।
- স্মারকভাস্কর্য: ‘ফিরে দেখা ৭১’ (অবস্থান: দুই নম্বর রেলগেট)
- আলোচ্য বৈঠক: জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষ, বিষয়: সড়ক নিরাপত্তা ও যানজট নিরসন
- প্রধান অংশগ্রহণকারীরা: নাগরিক সংগঠন, রাজনৈতিক প্রতিনিধি, প্রেসক্লাব ও মুক্তিযোদ্ধা
প্রস্তাবিত ধাপ ও স্থানীয় প্রভাব
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা যে প্রধান সিদ্ধান্তগুলো মোতাবেক কথা বলেন, তার মধ্যে আছে—অপসারণ না করে প্রতিস্থাপন, জায়গার দখল নির্ণয় করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে গেটের জায়গা সম্প্রসারণ করে ভাস্কর্যের জন্য প্রাণকেন্দ্র রাখা। এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে গেট এলাকার ট্রাফিক-প্রবাহে পরিবর্তন আসতে পারে; একই সঙ্গে স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণের বিষয়টি ও শহরের চিত্র-পরিচ্ছদ বজায় থাকবে।
| দলের/সংস্থার নাম | অবস্থান/বক্তব্য |
|---|---|
| নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলন (রফিউর রাব্বি) | ভাস্কর্য রাখতে চান |
| মহানগর বিএনপি (আবু আল ইউসুফ খান টিপু) | রাস্তার জন্য অসুবিধাজনক ও দখল ইস্যু তুলে ধরেন |
| নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাব (আফজাল হোসেন পন্টি) | প্রতিস্থাপনের পক্ষে; সরানো হলে চেতনা চলে যাবে না বলেছেন |
| সিটি করপোরেশন প্রশাসক (সাখাওয়াত হোসেন খান) | স্থানান্তর ও স্থানে পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনার কথা বলেছেন |
নাগরিক অংশগ্রহণ ও আগামী করণীয়
ভাস্কর্যের পক্ষে ও বিপক্ষে উভয় পক্ষেই বক্তারা নাগরিক স্বার্থ ও নিরাপত্তার কথা বলেছেন। এখন স্থানীয় প্রশাসনকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে জনগণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে বসে সার্বিক সমাধান বের করতে হবে—যা স্মৃতিসৌধের মর্যাদা বজায় রাখবে এবং ধারা প্রবাহে যানজট ও নিরাপত্তা ইস্যুও সমাধান করবে।
এ মুহূর্তে সরকারি কোনো চূড়ান্ত আদেশ বা স্থানান্তরের সময়সূচি অনুল্লিখিত। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে ভবিষ্যতে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেটি জেলা প্রশাসন ঘোষণা করবে—এমনটাই প্রত্যাশা বিহিত বক্তব্যে প্রকাশ পায়।
অনেকের প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে: স্মৃতি সংরক্ষণ বনাম জনস্বার্থ—কোনটিই বেশি প্রাধান্য পাবে? এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধানেই এখন স্থানীয় গণমাধ্যম, নাগরিক সংগঠন ও প্রশাসনের পর্যায়ে আলোচনার ঢেউ বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।