বান্দরবানের দূর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে রাত নেমে এলে শত শত গ্রামে নেমে আসে ঘন অন্ধকার। জেলা বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবান জেলার সাতটি উপজেলায় মোট ১,৫০০টি গ্রাম রয়েছে; এর মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি বিদ্যুৎবঞ্চিত রয়েছে প্রায় ৬০০টি গ্রাম। আর কিছু গ্রামে বিদ্যুৎ আংশিকভাবে পৌঁছেছে। রাত হলে কুপির আলো, ছোট সোলার ল্যাম্প বা মোমবাতি ছাড়া আলো-বিদ্যুৎ তারা পায় না—এই বাস্তবতা কয়েক দশক ধরে অপরিবর্তিত।
শিক্ষা ও যোগাযোগে সরাসরি প্রভাব
রেমাক্রী ইউনিয়নের মতো কয়েকটি প্রত্যন্ত গ্রামে সন্ধ্যার পর শিশুরা পড়ার জন্য কুপর আলো কিংবা মোমবাতির ওপর নির্ভরশীল। স্কুল–কলেজে ডিজিটাল ক্লাসের সুবিধা না থাকার ফলে তারা উন্নত কমিউনিকেশন ও অনলাইন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। স্থানীয় এক শিক্ষার্থী বলেন—
“আমাদের গ্রামে ছোটবেলা থেকে এখনো বিদ্যুতের আলো দেখিনি। প্রতিদিন মোমবাতি আর কুপির আলোতেই পড়ালেখা করতে হয়। কারেন্ট আর নেটওয়ার্ক না থাকায় ডিজিটাল ক্লাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।”
এই অবস্থা শুধু শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে না; যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, রাতের নিরাপত্তা ও ব্যবসাভিত্তিক কাজেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনেক গ্রামে কেন্দ্রীয় চিকিত্সা কেন্দ্রগুলোতে স্থায়ী বিদ্যুতের অনুপস্থিতি হাসপাতাল সেবাকে সীমিত করে দেয়।
কেন পৌঁছে না বিদ্যুৎ?
বান্দরবান বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে পাওয়া তথ্য বলছে, গ্রামগুলোর অনেক অংশে ভূগোলগত বাধা, যোগাযোগের দুরবস্থা ও বরাদ্দের অভাব মূল কারণ। পাহাড়ি পথ ঘিরে নৌকা কিংবা দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ টহল পথ পাড়ি দেওয়ার ফলে লাইন বসানো তথা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। তাছাড়া সরকারি বরাদ্দ না থাকার কারণে অনেকে এখনও সোলার ল্যাম্পে নির্ভরশীল।
স্থানীয়দের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি
রাতে কোনো আলো না থাকায় গ্রামীণ ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা বাঁধা পেরিয়ে বাজারজাতকরণ কঠিন। স্থানীয়রা জানান, প্রান্তিক পর্যায়ে উৎপাদিত পণ্যের মান ও সময়মত বাজারজাতকরণ প্রভাবিত হচ্ছে। ফলে আয়ের সুযোগ সীমিত থাকে এবং দারিদ্র্য গভীর হয়।
কর্মসূচি ও বিকল্প প্রযুক্তি
অফিসিয়াল তথ্য বলছে—কয়েকটি জায়গায় ছোট সোলার প্যানেল সুবিধা থাকলেও তা ব্যাপক নয়। বড় স্কেল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য রাস্তা, বনভূমি সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সহমত প্রয়োজন। বিকল্প হিসেবে সমন্বিত সমাধানগুলোর মধ্যে থাকতে পারে:
- গ্রাম পর্যায়ে বড় সোলার মাইক্রোগ্রিড ব্যবস্থা;
- প্রয়োজন অনুসারে ব্যাটারি রান টাইম বৃদ্ধি করে সোলার লাইট সরবরাহ;
- সংযুক্ত রাস্তাঘাট ও নদীপথে উন্নয়ন করে লাইন বসানোর সম্ভাবনা সৃষ্টি করা।
সরকারি উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ
বহু বছর ধরে স্বাধীন দেশের অর্ধশতাব্দী পার হলেও এই অঞ্চলের বহু গ্রাম এখনো জাতীয় গ্রিডের আলো থেকে বঞ্চিত। এতে স্থানীয় মানুষজনে হতাশা দেখা যায়। বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিনিধিরা জানায়, পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে প্রকল্প অনুমোদন, বরাদ্দ পাওয়া এবং দুর্গম এলাকায় বাস্তবায়ন জটিল।
মানুষের কণ্ঠ থেকে কি পাওয়া যায়?
স্থানীয়রা বলছেন, সময়োপযোগী অবকাঠামো না থাকায় স্কুল-কলেজের পড়াশোনা, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থা সবই পিছিয়ে পড়ছে। অনেক সংগঠন ক্ষুদ্র খাতে সোলার লাইট বিতরণ করলেও তা সমাধান হিসেবে পর্যাপ্ত নয়।
সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র
| বিষয় | পরিমাণ |
|---|---|
| মোট গ্রাম (জেলা) | ১,৫০০ |
| পুরোপুরি বিদ্যুতবিহীন গ্রাম | ৬০০ |
| আংশিক বিদ্যুৎ পাওয়া গ্রাম | ৩০০ (জরিপ অনুযায়ী) |
স্থানীয় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ে প্রয়োজন উপরের চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে টেকসই সমাধান নেয়া। দূর্গম এসব এলাকার মানুষের মৌলিক নাগরিক সুবিধা—বিদ্যুৎ—প্রতিটি মানুষের বাসিন্দা অধিকার; তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
রিপোর্টটি বান্দরবান জেলার দুর্গম গ্রামগুলোতে বিদ্যুৎবণ্টন সংক্রান্ত সরকারি তথ্য ও স্থানীয় জনজীবনের সাক্ষাৎকারের সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়েছে।