শরীয়তপুর সদর উপজেলার হাজরাসার গ্রামে কৃতিনাশা নদীর তীরেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা মনির হোসেন মাঝি দীর্ঘদিন রাজনীতির মাঠে ছিলেন। ছাত্রদল থেকে রাজনীতি শুরু করে পরে জেলা যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে থেকে বহুবার জেল-জুলুমও সহ্য করেছেন—তবে শেষ বিপর্যয়টি ছিল ব্যক্তিগত ও অর্থনৈতিকভাবে অতিকষ্টকর।
চিকিৎসা-ব্যয় ও আর্থিক ভাঙ্গন
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চিকিৎসকেরা জানান তিনি ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত। এরপর ক্যানসারের দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা শুরু হয়। গত দুই বছরে চিকিৎসায় খরচ হয়েছে প্রায় ত্রিশ লাখ টাকা—জন্মভূমির পাশে থাকা কৃষিজমি বিক্রি করে, পরিবারের সঞ্চয় শেষ করে ও ঋণ নিয়ে এ চিকিৎসা চালানো হয়। তারপরও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা ক্রমে অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরিবারের দাবী, জীবনের শেষ দুই মাসে তিনি নিয়মিত প্রয়োজনীয় ওষুধও যোগাড় করতে পারেননি।
বাক্তিগত আঘাতের ধারাবাহিকতা
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে ফরিদপুরে বিএনপির একটি বিভাগীয় সমাবেশে উপস্থিত থাকতে লাগপাল খবর পান যে তার স্ত্রী স্ট্রোক করেছেন; পরে স্ত্রী মারা যান। জীবনসঙ্গীকে হারানোর শোক কাটানোর আগেই পরের বছর ক্যানসারের রোগ নির্ণয়—এই দুটো সংকট তার জীবন ও পরিবারের জন্য ধাক্কা হিসেবে আসে।
পরিবারের ভবিষ্যৎ ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া
মনির মাঝির মৃত্যুর ফলে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তায় পড়েছে তার দুই সন্তান। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পড়েছে দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় ও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার প্রশ্ন। বড় ছেলে তাজমুল বর্তমানে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত; ছোট ছেলে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র।
স্থানীয় যুবদলের কয়েকজন নেতা—রুহুল আমিন ও সালাম মাঝি—বলেছেন, দেশের ও দলের কঠিন সময়ে মনির মাঝি সবসময় সামনের সারিতে ছিলেন এবং রাজনীতির জন্য তিনি অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাদের বক্তব্যে কেবল শোক নয়, দলের কর্মহীন সদস্য হিসেবে এই ধরনের নেতাদের শেষকৃত্য ও চিকিৎসাসহ আর্থিক সহায়তার অনিশ্চয়তাকেও তুলে ধরা হয়েছে।
আর্থিক খরচ ও বাস্তব চিত্র
| ধরণ | বিবরণ |
|---|---|
| চিকিৎসার মেয়াদ | প্রায় দুই বছর |
| আনুমানিক চিকিৎসা ব্যয় | প্রায় ৩০ লাখ টাকা |
| অর্থ সংগ্রহের উপায় | সঞ্চয় নষ্ট, পৈতৃক কৃষিজমি বিক্রি, ঋণ |
| শেষ দুই মাস | প্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়মিত পাওয়া যায়নি (পারিবারিক দাবি) |
স্থানীয় প্রভাব ও মানবিক চাহিদা
একটি রাজনৈতিক ও কর্মজীবনে নিবেদিত ব্যক্তির মৃত্যু শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্তরে নয়, স্থানীয় সামাজিক পরিবেশেও ধাক্কা দেয়। পারিবারিক ভরণপোষণের দায়িত্ব থাকা অবস্থায় উপার্জনক্ষম সদস্যের আকস্মিক ক্ষতি স্থানীয় গ্রাম-সমাজিক নিরাপত্তা ও শিশুদের শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে।
- পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে শিক্ষাগত ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা।
- ঋণ ও চিকিৎসা খরচ মেটাতে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি হওয়ায় স্থায়ী আয়ের সংকট।
- স্থানীয় দলনায়ক ও সমর্থকদের মধ্যে শোক ও সহায়তার অনুরোধ।
বর্তমানে পরিবারের সদস্যরা কীভাবে দৈনন্দিন খরচ, ঋণের পরিশোধ ও দুই সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে নিবেন—এ নিয়ে উদ্বেগ গৃহস্থালির প্রতিটি সদস্যকে ঘেঁষে আছে। স্থানীয় নেতারা বলেছেন, প্রয়োজনে দলের স্থানীয় শাখা, শুভানুধ্যায়ী ও সমাজের লোকজনকে নিঃসন্দেহে এগিয়ে আসতে হবে, তবেই ক্ষতিটা কিছুটা লাঘব করা সম্ভব হবে।
মনির মাঝি রাজনৈতিক জীবনে যে পরিচিতি ও সম্পর্ক গড়েছিলেন, সেগুলো এখন পরিবারকে আয়োজন-যোগ্য কিছু সহায়তার পথ খুলে দিতে পারে—তবে এটি নির্ভর করবে স্থানীয় ব্যবস্থাপনা ও জনহিতৈষী উদ্যোগের ওপর।
শরীয়তপুরের হাজরাসার গ্রাম ও জেলা রাজনীতিতে মনির মাঝি একজন পরিচিত নাম; তাঁর মৃত্যু স্থানীয় রাজনৈতিক পুরনো-নবীন কর্মীদের মধ্যে শোক ছড়িয়ে দিয়েছে এবং একই সঙ্গে দেখিয়েছে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের গুরুত্ব ও সমাজিক নিরাপত্তা বৃত্তের তৎপরতা কতটা অনাবশ্যক।