আয়োজন ও বক্তব্য
রোববার (৯ আগস্ট) সকালে রাঙ্গামাটি পৌরসভা প্রাঙ্গণে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও আনুষ্ঠানিক আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটি আয়োজনে ছিল আন্তর্জাতিক আদিবাসী উদযাপন কমিটি, রাঙ্গামাটি শাখা। মূল আলোচ্য বিষয় ছিল পার্বত্য চুক্তি, আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমি সমস্যা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জুম ইসথেটিক কাউন্সিলের সভাপতি শিশির চাকমা, সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি ও সাবেক উপসচিব শ্রী প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট চঞ্চু চাকমা, ফদাং তাং রান্দাল, সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহ সভাপতি থোয়াই অং মারমা, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য দেব প্রসাদ দেওয়ান এবং রাঙ্গামাটির বিশিষ্ট আইনজীবী এ্যাডভোকেট জুয়েল দেওয়ান প্রমুখ।
চুক্তির বিরুদ্ধে নয় — বাস্তবায়নের জোরালো আহ্বান
শিশির চাকমা তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেন যে, পার্বত্য চুক্তি নিয়ে সংকট থাকলেও তা বাতিলের দাবি নয়। তিনি উল্লিখিত বক্তব্যে বলেন—
"পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাংলাদেশ সংবিধানের আলোকে করা হয়েছে। এই চুক্তিতে কোনো অসাংবিধানিক বিষয় রাখা হয়নি। তাই চুক্তি বাতিল নয়, বরং এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।"
তিনি এছাড়াও বলেন যে, পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই প্রত্যাশিত ফল পাওয়া সম্ভব।
আদিবাসীদের দাবি ও আশঙ্কা
আলোচনায় অংশ নেওয়া বক্তারা একত্রে জানান যে পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নানা নিপীড়ন ও অধিকার বঞ্চনার শিকার। তাদের মতে ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের ক্ষতি—এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বিশেষভাবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো জোর দিয়ে তোলেন:
- পার্বত্য চুক্তির দ্রুত ও পূর্ণ বাস্তবায়ন — চুক্তির প্রতিশ্রুতিসমূহ বাস্তবায়নে সরকারি পর্যায়ে সক্রিয় উদ্যোগের দাবি।
- ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান — স্থানীয় মানুষের জমি অধিকার নিশ্চিত করা ও বিতর্ক সম্পর্কিত কার্যকর সমাধান।
- শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ — পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর শিক্ষাগত সুবিধা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির জন্য নীতি প্রণয়ন।
- সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা — স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ।
স্থানীয় রাজনৈতিক প্রসঙ্গ
আলোচনায় অংশ নেওয়া সদস্যরা উল্লেখ করেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে স্থানীয় মানুষের আস্থা ক্ষুন্ন হতে পারে। তারা বলেন, সরকারের সঙ্গে সংলাপ ও সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ ন্যায্য সমাধান না হলে পাহাড়ের সামাজিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়বে। বক্তারা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা রেখে সরকারের সদিচ্ছা আশা করেন এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
উপস্থিত নেতাদের প্রত্যাশা ও পরবর্তী পথ
আলোচনা শেষে বক্তারা সংরক্ষিত সময় ও সম্পদের যথাযথ বণ্টন, ভূমি দলিলের স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন বক্তা মনে করেন, সরকার ও স্থানীয় রাজনৈতিক অংশীদারদের মধ্যে গঠনমূলক সংলাপ চালিয়ে গেলে পার্বত্য চুক্তির সঠিক বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
| পদবী/সংগঠন | প্রধান বক্তব্য/আবেদন |
|---|---|
| শিশির চাকমা (জুম ইসথেটিক কাউন্সিল) | চুক্তি বাতিল নয়, পূর্ণ বাস্তবায়ন দরকার |
| প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা | সভাপতিত্ব ও স্থানীয় দুর্যোগ মোকাবেলার আহ্বান |
| থোয়াই অং মারমা, দেব প্রসাদ দেওয়ান, জুয়েল দেওয়ান | ভূমি-শিক্ষা-সংস্কৃতি সংরক্ষণে সক্রিয় ভূমিকা |
স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন যে, আদিবাসী অধিকার ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে যে অনিশ্চয়তা আছে, তাকে কমাতে হলে সরকারি নীতি ও স্থানীয় অংশীদারদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। রাঙ্গামাটির জন্য এটি শুধু আইনি বা রাজনৈতিক ইস্যু নয়—এটি এলাকার সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক ভবিষ্যতের প্রশ্নও বটে।
রাঙ্গামাটিতে আয়োজিত এই দিনটি শুধুমাত্র উত্সবপূর্ণ নয়; এটি আদিবাসী জনদের দীর্ঘমেয়াদি দাবি ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি মঞ্চ হিসেবে উপস্থিত ছিল। আগামী দিনগুলোতে স্থানীয় নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় সরকার কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করে, সেটাই দিবসটির প্রকৃত সফলতা নির্ধারণ করবে।
রিপোর্ট: অংশুমান চাকমা, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি, WE NEWS