মৌলভীবাজারে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় চা শিল্পে মারাত্মক খাদানক্ষতি হচ্ছে। জেলার বাগানগুলোতে সার্বক্ষণিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে মাত্র ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে; বাকি ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ আসে না। ফলে কারখানাগুলোতে ট্রাফ হাউজে কাঁচা চা পাতা রেখেই প্রক্রিয়াজাত করায় প্রতিদিন হাজার হাজার কেজি কাঁচা চাপাতা নষ্ট হচ্ছে—চা সংশ্লিষ্টরা এই বক্তব্য জানিয়েছেন।
চায়ের মৌসুমে ক্রমবর্ধমান ক্ষতি
জেলার ৯৩টি চা বাগান বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জেরে বড় ধরনের উৎপাদনঝুঁকিতে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি অনুযায়ী, প্রতিটি বাগানে প্রতিদিনই ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে প্রক্রিয়াজাতকরণ (ওয়েদারিং) প্রক্রিয়া স্থগিত হলে পাতার মানও খর্ব হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়; ফলত ভবিষ্যতে বিক্রয় ও রপ্তানিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ক্ষতির বর্ণনা ও দায়ী পক্ষের মন্তব্য
বাগান পর্যায়ের শ্রমিক ও ব্যবস্থাপকরা বলছেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে কারখানা পুনরায় চালু করতে বিকল্প প্রযুক্তি বসালে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে, সেই সময় কাঁচা পাতা ট্রাফ হাউজে রাখা থাকায় নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। রাজনগরের ইটা চা বাগানের শ্রমিক আকাশ হোসেন বলেন,
“একবার বিদ্যুৎ গেলে বিকল্প প্রযুক্তিতে কারখানা চালু করতে ১ ঘণ্টা সময় লাগে। এতে সময়ের অপচয় হয়। আবার পাতার গুণগত মানও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।”
কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানের শ্রমিক রামগোপাল গৌড় জানিয়েছেন, ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে যন্ত্রপাতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন,
“প্রতিদিন ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এসময় কারখানা চালু রাখতে ১০০ থেকে ২০০ লিটার ডিজেল ব্যবহার করতে হয়।”
চা বাগান ব্যবস্থাপক মো. জামাল উদ্দিন বলেন, অনবরত বিদ্যুৎ না থাকলে ট্রাফ হাউজে রাখা কাঁচাপাতা ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়। রাজনগরের করিমপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক ইফতেখার আহমদ বলেন, সবুজ চা অত্যন্ত স্পর্শকাতর; সময়মত ম্যানুফ্যাকচারিং না করলে মান নষ্ট হয় এবং ক্ষতিরর্শ বৃদ্ধি পায়।
স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ পক্ষের ব্যাখ্যা
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, মেটানো চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। তবে তিনি জানিয়েছেন সমস্যার সমাধান আসছে বলে আশা রাখা যায়।
কারিগরি ও আর্থিক প্রভাব
বিদ্যুৎ না থাকায় বাগানগুলো জেনারেটর চালাতে বাধ্য হচ্ছে; এতে জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত খরচ বেড়ে যায়। সূত্রগুলো বলছে, প্রতিদিন ১০০–২০০ লিটার ডিজেলের বেশি ব্যবহার হয়। জ্বালানির এই অতিরিক্ত ব্যয়, পাতা নষ্ট হওয়া ও উৎপাদন বিলম্ব—এই সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং চায়ের গুণগতমান নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।
- চাহিদা এবং সরবরাহের অনুপাত: ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, ৯ ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে।
- প্রভাবিত বাগান: জেলা জুড়ে ৯৩টি চা বাগান ক্ষতিগ্রস্ত।
- দৈনিক ক্ষতি: প্রতিটি বাগানে আনুমানিক ২–৩ লাখ টাকা ক্ষতির খবর।
- জ্বালানি ব্যবহার: লোডশেডিং চলাকালে প্রতিদিন প্রায় ১০০–২০০ লিটার ডিজেল কাজে লাগে (সূত্র: কারখানা শ্রমিক)।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিণতি
চা শিল্প শুধু জেলা নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মৌলভীবাজারে উৎপাদনহীনতা বাড়লে না শুধু মালিকপক্ষের লোকসান বাড়বে, বরং শতশত শ্রমিকের মজুরি ও কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়বে। বাগান-চলতি কাজ বন্ধ কিংবা কম হলে শ্রমিকদের কাজের ঘণ্টা ও আয় হ্রাস পেতে পারে—এটি স্থানীয় অর্থনীতি ও গৃহস্থালির জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে।
কী হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ?
চা বাগানগুলোতে বিদ্যুতের বিষয়ে দ্রুত স্থায়ী সমাধান না হলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাগুলোকে এলাকাভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, জরুরি ত্রাণমূলক ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে বলা হচ্ছে। উৎপাদনশীল মৌসুমে তেমন উদ্যোগ না নিলে চা শিল্পে বড় ধরনের ব্যাঘাত দেখা দিতে পারে।
রিপোর্টার: সাবরিনা হক, মৌলভীবাজার থেকে