পঞ্চগড়ের আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে বাবা-মায়ের স্নেহ ছাড়াই বড় হওয়া নয় কিশোর মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। অনাথ, ছিন্নমূল বা পারিবারিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত অবস্থায় পড়াশোনা করে তারা নিজেরাই স্বাবলম্বী হওয়ার পথে প্রথম বড় ধাপটি পেরেছেন।
শৈশব ও আশ্রয়
শিশু নগরীটি পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের জলাপাড়া গ্রামে অবস্থিত। ২০১২ সালে অনাথ ও পথশিশুদের নিরাপদ আশ্রয় ও শিক্ষার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম শুরু করে এবং বর্তমানে এখানে ১৬০ জন শিশু আছে। দুইটি বড় ভবনের মাঝখানে বিশাল খেলার মাঠ—যেখানে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিশুদের খেলাধুলা ও পড়াশোনার আয়োজন চলে।
পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের প্রোফাইল
এসএসসি পরীক্ষায় পাস করা নয় কিশোরই পঞ্চগড় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে অংশ নিয়েছেন। উত্তীর্ণদের নামগুলো হলো:
- সাকিব হাওলাদার
- সুমন মিয়া
- আল-আমিন
- সাকিব
- নিরব ইসলাম
- জুয়েল হাওলাদার
- মেহেদী হাসান
- আনিছুর ইসলাম
- আলিউল ইসলাম
| প্রতিষ্ঠান | পরীক্ষা | উত্তীর্ণ ছাত্রসংখ্যা |
|---|---|---|
| আহছানিয়া মিশন শিশু নগরী, জলাপাড়া | এসএসসি (পঞ্চগড় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ) | ৯ |
ব্যক্তিগত স্মৃতি ও আশা
এসএসসি পাস করা কিশোরদের অনেকেরই শিশুকাল কষ্টের ও অনিশ্চিত। সুমন মিয়া সাতের নিচে বয়সে পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হন; পরে কয়েকটি কেন্দ্র-কনভেন্ট আসিন করে ২০১৫ সালে আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে যুক্ত হন। নিজের শৈশবের গল্প বলতে গিয়ে সুমনের গলায় ক্লান্তসুর ধরা পড়ে।
“৬ বছর বয়সে পরিবার থেকে হারিয়ে যাই। কোথা থেকে হারিয়েছি, সেটাও মনে নেই। এখানে এসে ১০ বছর কাটলো। পরিবারের কেউ বেঁচে আছে কি না, আমি জানি না। তবু এখানে শিক্ষা পেয়ে আমি খুশি,”
নিরব ইসলামও দীর্ঘদিন ধরে শিশু নগরীর সদস্য। স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে এবার তিনি এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তার মতো অন্যান্য কিশোরদের কথায় ব্যক্ত হওয়া গভীর আবেদন আর অনিশ্চয়তা—কেউ পরিবারের সন্ধান চান, কেউ স্বাবলম্বী হয়ে ভালো মানুষ হয়ে ওঠার প্রতিশ্রুতি দেন।
প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
আহছানিয়া মিশন শিশু নগরী পরিচালনা ও পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করে অনাথ ও বঞ্চিত শিশুদের জন্য। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো নিরাপদ আশ্রয় দেয়া, নিয়মিত শিক্ষা নিশ্চিতে সহায়তা করা এবং শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়তে সক্ষম করা। শিশুদের মধ্যে খেলার বাইরে পড়াশোনা, আত্মনির্ভরতার শিক্ষা প্রদান ও মননচিকিৎসাসহ সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে।
স্থানীয় প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব
পঞ্চগড়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়ে কিংবা পারিবারিক বিভাজনের কারণে বহু শিশু সুরাহাহীন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় এবং জাতীয় মেলবন্ধন, দাতব্য সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। এসব সংস্থার শিক্ষাগত সহায়তা না থাকলে অনেকে Formal শিক্ষার বাইরে থেকে যেতেও পারে—যা ভবিষ্যতে তাদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও চাওয়া
উত্তীর্ণ নয় কিশোরের প্রত্যেকের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে আলাদা লক্ষ্য। কেউ পেশাগত প্রশিক্ষণ নিতে চায়, কেউ উচ্চশিক্ষার দিকে আগ্রহী। সকল ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন প্রয়োজন—শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের জন্য আর্থিক ও নির্দেশনা হলে তারা সমাজে স্থায়ীভাবে আত্মনির্ভর হয়ে উঠতে পারবে।
স্থানীয় শিক্ষকরা মনে করান যে, মানসিক সাপোর্ট এবং স্থিতিশীল পরিবেশ না থাকলে শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হয়। তাই অনাথ শিশুদের জন্য কেবল খাবার-বাসস্থান নয়, মানসিক সহায়তা, পরিচর্যা ও শিক্ষার মান উন্নত করা জরুরি।
এসব কিশোরদের সাফল্য স্থানীয় সমাজে আশা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়—প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটির সমন্বিত প্রচেষ্টায় অনাথও শিক্ষা অর্জন করে সুদূর গন্তব্য বিস্তৃত করতে পারে।