হাজীগঞ্জে বর্জ্য থেকে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ ঝুঁকি
হাজীগঞ্জ পৌরসভার বিভিন্ন সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার বহুল কোটি টাকা খরচ হলেও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরে এ পৌরসভায় মোট উৎপন্ন হচ্ছে ৭ হাজার ১৮৯ টন কঠিন বর্জ্য; আর এর মধ্যে ৫ হাজার ২৬৯ টন বা প্রায় ৭৩.৩% যথাযথ ব্যবস্থাপনার বাইরে পড়ছে।
বর্জ্য শোধনাগার না থাকায় পৌর এলাকার জনবহুল স্থানগুলোতে বর্জ্য উন্মুক্তভাবে ফেলা হচ্ছে—এটি কেবল চেহারা নষ্ট করছে না, পরিবেশদূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
বাজেট—বৃহৎ ব্যয়, কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আলাদা বরাদ্দ নেই
সরকারি ও উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নে সড়ক, ড্রেন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য তহবিল যাচ্ছে। তথ্যে দেখা যায় হাজীগঞ্জ পৌরসভার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মোট বাজেট ছিল ১১৭ কোটি ৩৮ লাখ ৬০ হাজার ২৫০ টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব ও উন্নয়ন খাতের বিভাজন এবং উন্নয়ন বাজেটের পরিমাণ নিচে টেবিলে দেখানো হলো:
| বিভাগ | টাকার পরিমাণ |
|---|---|
| মোট বাজেট | ১১৭,৩৮,৬০,২৫০ |
| রাজস্ব বাজেট | ৩০,০৩,৪৬,২৫০ |
| উন্নয়ন বাজেট | ৮৭,৩৫,১৪,০০০ |
তবে বাজেটের খাতভিত্তিক বিবরণে রাস্তা, ড্রেন, সেতু-কালভার্ট ও হাটবাজারসহ নানা অবকাঠামোর জন্য বরাদ্দ থাকলেও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক ও লক্ষ্যভিত্তিক বরাদ্দ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না। ফলে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ সত্ত্বেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মৌলিক অবকাঠামো অনুপস্থিত থেকে গেছে।
বহু প্রকল্পের মধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে অব্যাহত রেখেছে প্রান্তে
ওয়াটারএইড বাংলাদেশ কর্তৃক করা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে হাজীগঞ্জ পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০১১ সালে প্রণীত পৌরসভার মাস্টারপ্ল্যানেও ভবিষ্যৎ বর্জ্য সংকটের আশঙ্কা ও সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে ঘর থেকে বর্জ্য সংগ্রহ, স্থানান্তর কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, নির্দিষ্ট এলাকার জন্য স্বচ্ছ বিধান এবং পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার সুপারিশ ছিল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে এই সুপারিশগুলোর গুরুতর অংশ বাস্তবায়িত হয়নি।
- বর্জ্য শোধনাগার বা ট্রিটমেন্ট ইউনিট অনুপস্থিত।
- জনবহুল চারটি স্থানে নিয়মিত উন্মুক্ত বর্জ্যফেলা চলছে।
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বাজেট বরাদ্দ ও নজরদারি অভাব—দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ছে।
এক স্থানীয় ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘‘পরিকল্পনা ও প্রকল্পে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পরও নাগরিকদের জন্য কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি।’’
আন্তর্জাতিক সহায়তায় চালু থাকা নগর শাসন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (আইইউজিআইপি)—যার মেয়াদ ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত—ও হাজীগঞ্জে অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও অন্যান্য সংস্থার অর্থায়ন রয়েছে এবং উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে নগর পরিচালনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রয়েছে। তবু এলাকা ভিত্তিক বাস্তবকর্মে মূলত সড়ক ও ড্রেন নির্মাণে বেশি ফোকাস ছিল বলে দেখা গেছে।
হাজীগঞ্জ পৌরসভার বর্তমান অবস্থা স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়ন পরিকল্পনাকারীদের কাছ থেকে যে ক্ষুদ্রতর বিষয়ে বেশি গুরুত্ব পায়—তেমনটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—এ বিষয়ে ত্বরান্বিত ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। না হলে বছরে হাজার হাজার টনের বর্জ্য পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে স্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যা নগর জীবনের মানকে প্রভাবিত করবে।
চাহিদা—বিশ্লেষণে উঠে আসে যে, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা বরাদ্দ, শোধনাগার স্থাপন, নির্দিষ্ট বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার বাস্তবায়ন ব্যতীত অন্য কোনও বিকল্প নেই।
এই সংবাদ প্রতিবেদন স্থানীয়বাসী, পৌর কর্তৃপক্ষ ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানায়।