চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলায় ২০১৬ সালে ঘটে যাওয়া নুর মোহাম্মদ নামের একজনের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত মামলায় আদালত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) আসামি সুজন সরকার(৩৫)কে জাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন। একই সঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে; জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাস সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে রায়ের সঙ্গে বলা হয়েছে।
আলাপ-আলোচনার কেন্দ্রটি—আর্থিক লেনদেন
আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে যে অভিযুক্ত সুজন সরকারের এবং নিহত নুর মোহাম্মদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল ও তারা বড় স্টেশন এলাকায় ব্যবসা করতেন। মামলার নথি থেকে জানা গেছে, তাদের মধ্যে বিদ্যমান আর্থিক লেনদেনই হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট। রায় ঘোষণার সময় সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ সামছুন্নাহার এ আদেশ দেন।
ঘটনার রূপরেখা ও তদন্ত
নথি সূত্রে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ২ মার্চ রাতে মতলব দক্ষিণ উপজেলার ঘোড়াধারী গ্রামের একটি খালি জমিতে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ দেখতে পান গ্রাম পুলিশ নিহাই দাস ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. জাকির হোসেন। পরদিন ওই ইউপি সদস্য মামলা দায়ের করেন এবং তদন্তের এক পর্যায়ে পুলিশ আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অভিযুক্ত সুজন সরকারকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন 당시 মতলব দক্ষিণ থানার উপ-পরিদর্শক তপন চন্দ্র দাস, যিনি ২০১৭ সালের ২৫ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
আদালতে মামলার প্রমাণ উপস্থাপন ও সাক্ষ্যগ্রহণে দীর্ঘ সময় লেগে থাকে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর কোহিনুর রশিদ জানান:
“দীর্ঘ ১০ বছরে মামলায় ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।”
রায়ে বলা হয়েছে, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও মামলার নথিপত্র পর্যালোচনার পাশাপাশি আসামির অপরাধ স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে নাম থাকা অন্য তিন আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
নিহত ও দণ্ডপ্রাপ্তের পটভূমি
মৃত ব্যাক্তি নুর মোহাম্মদ চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন ক্লাব রোড এলাকার মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে। তিনি পেশায় কসাই ছিলেন এবং বড় স্টেশন এলাকায় গরু জবাই ও মাংস বিক্রির ব্যবসা করতেন। অপরদিকে দণ্ডপ্রাপ্ত সুজন সরকার মতলব দক্ষিণ উপজেলার উপাদী দক্ষিণ ইউনিয়নের উত্তর ঘোড়াধারী গ্রামের সরকার বাড়ির ছেলে; পেশায় জেলে ও বড় স্টেশন এলাকায় মাছের ব্যবসা করতেন।
- ঘটনা: ২০১৬ সালের ২–৩ মার্চ, মতলব দক্ষিণ উপজেলার ঘোড়াধারী গ্রামে মরদেহ উদ্ধার।
- অভিযোগ দাখিল: ৩ মার্চ (বাদী—ইউপি সদস্য জাকির হোসেন)।
- আরোপীর গ্রেফতার: ২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবর।
- অভিযোগপত্র দাখিল: ২০১৭ সালের ২৫ মে (তদন্তকারী এসআই তপন চন্দ্র দাস)।
- রায়: ২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট—জাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানা।
| তারিখ | ঘটনা |
|---|---|
| ২–৩ মার্চ ২০১৬ | মরদেহ উদ্ধার ও ইউপি সদস্যের মামলা দায়ের |
| ২৯ অক্টোবর ২০১৬ | সুজন সরকারের গ্রেপ্তার ও আদালতে সোপর্দ |
| ২৫ মে ২০১৭ | অভিযোগপত্র দাখিল |
| ২৭ আগস্ট ২০২৬ | সুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানা |
মামলাটি আসামী পক্ষে পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট রাজেস মুখার্জী। স্থানীয় সমাজে এই ঘটনায় দীর্ঘ সময় ধরে রয়েছে উদ্বেগ ও আলোচনাসূচক পরিবেশ—বড় স্টেশন এলাকার ব্যবসায়িক সম্পর্ক থেকে পারস্পরিক আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি ঘটে বলে মামলার বিবরণে বলা হয়েছে।
চাঁদপুরের আদালত সূত্রে জানা যায়, আদালত অপরাধ প্রমাণ সাপেক্ষে নিষ্ঠা ও প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে; একই সঙ্গে অভিযোগের অতিরিক্ত তিনজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে কারণ তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ অপর্যাপ্ত রয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরবর্তী কার্যক্রম কী হবে, তা আদালতের রায়ে নির্ধারিত বিধি-নিষেধ অনুযায়ী কার্যকর করা হবে।
এই রায় চাঁদপুরের স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে থাকা মনে প্রাপ্ত প্রশ্নগুলোর একটিকে আইনের পথে সমাধান দিয়েছে। তবে এই হত্যাকাণ্ড ও দীর্ঘ সময়ের বিচারপ্রক্রিয়া এলাকার নিরাপত্তা, ব্যবসায়িক বিবাদ নিষ্পত্তি এবং স্থানীয় সমাজের ভরসা ও চাপ মোকাবেলায় নতুন চিন্তার নির্দেশনা যোগাবে—এটাই হল স্থানীয় প্রত্যাশা।