চাঁদপুর সদর উপজেলা অডিটোরিয়ামে রোববার অনুষ্ঠিত মৎস্য বিষয়ক একটি আলোচনা সভায় বক্তারা জানান, নদীতে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার বন্ধ করা গেলে দুই বছরের মধ্যে স্বল্প নয়নীয় কাঁচামাল ও পোনা সংরক্ষণের ফলে মাছের উৎপাদন বাড়বে। সভায় বক্তব্য রাখেন চাঁদপুর-০৩ (সদর-হাইমচর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক।
অভিযোগ ও আশংকা
বক্তারা বলেন, ইলিশসহ দেশীয় মাছ আহরণে বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা যায় নিষিদ্ধ ধরন—বিশেষত কারেন্টজাল ও চায়না দুয়ারী নামের জাল। এসব জাল নদীর তলদেশসহ জলজ প্রাণীর প্রজননস্থলে ব্যাপক ক্ষতি করে বলে তারা সতর্ক করেন। সভায় উপস্হিত মৎস্য কর্মকর্তা ও অন্যান্য বিশিষ্টদের বক্তব্যে উঠে আসে, নিষিদ্ধ জাল না রোধ করলে শুধু মাছই নয়, জলজ প্রাণীর জীববৈচিত্র্যও বিপন্ন হবে।
“নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার বন্ধ রাখলে দুই বছরের মধ্যে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।”
এ কথা বলেন সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। তিনি আরও বলেন, জেলা কেন্দ্রীক অঞ্চল হওয়ায় চাঁদপুরে যদি সম্মিলিতভাবে পরিকল্পিত উদ্যোগ নির্মাণ করা হয়, তাহলে ইলিশ ও অন্যান্য মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি কার্যত নিশ্চিত করা যাবে।
প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের মিলিত উদ্যোগ
সভায় জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান ও পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান। বক্তারা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের একক প্রচেষ্টায় কাজটি সফল হবে না বলে উল্লেখ করে স্থানীয় লোকজনসহ সমন্বিত অভিযান পরিচালনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
সভা সঞ্চালনা করেন চাঁদপুর সদর উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক। অন্যান্য বক্তব্যে অংশ নেন নৌ-পুলিশ চাঁদপুর অঞ্চলের পুলিশ সুপার সৈয়দ মোশফিকুর রহমান, ইউএনও এসএমএন জামিউল হিকমা, কোস্টগার্ড স্টেশনের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট সিফাত খালিদ, বিএমআরআই চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ ও চাঁদপুর মৎস্য প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ বি এম মোস্তফা কামাল।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও জনজীবন
সভায় বক্তারা উল্লেখ করেন, বাজারে ইলিশের মূল্য বর্তমানে এক কেজিতে ৩ হাজার ২শ’ থেকে ৫শ’ টাকা—যার ফলে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ইলিশ ক্রয় করা ক্রমেই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। তারা বলেন, কার্যকর সংরক্ষণ অভিযান না করলে ভবিষ্যতে মাছের সরবরাহ সংকুচিত হয়ে উচ্চবিত্তরাও ইলিশ ক্রয় করতে পারবে না।
কার্যকর পদক্ষেপের সুপারিশ
বক্তারা মৎস্য উন্নয়নে যে সব পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে তুলে ধরেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রশাসন-নাগরিক সহযোগিতায় নিয়মিত র্যাব ও নৌ-পুলিশ অভিযানের পরিকল্পনা করা।
- জাটকা সংরক্ষণ ও মা ইলিশ রক্ষায় স্থানীয় জেলে ও কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
- স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ও প্রচারণা কার্যক্রম চালানো।
- চাষযোগ্য এলাকায় পোনা উৎপাদন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করা।
উদাহরণ ও সন্মাননা
আলোচনা শেষে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের একটি পদযাত্রা (র্যালি) বের হয়। সভায় বরিশাল থেকে পাওয়া সহায়তা ও স্থানীয় সফল উদ্দোক্তাদের উদাহরণ তুলে ধরে প্রশাসন কার্প জাতীয় মাছের পোনা উৎপাদনে ও টেলাপিয়া মোনোসেক্স উৎপাদনে কয়েকজনকে সম্মাননা স্মারক ও সনদপত্র প্রদান করা হয়। সম্মাননা প্রাপ্তদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয় অনুষ্ঠানে।
| পদ | প্রতিনিধি |
|---|---|
| সংসদ সদস্য | চাঁদপুর-০৩ আসন |
| জেলা মৎস্য কর্মকর্তা | মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম |
| জেলা প্রশাসক | আহমেদ জিয়াউর রহমান |
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিষিদ্ধ জালবাহী কিছু মাছজবাইকারী এখনো নদীতে সক্রিয়। স্থানীয় নেতারা বলেন, নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি স্থানীয় উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি না-চললে কড়াকড়ি কার্যকরভাবে কার্যকর করা কঠিন হবে।
চাঁদপুরের একাধিক পরিবার জেলেপেশায় নির্ভরশীল। তাই মৎস্য সম্পদের সাসটেইনেবল ব্যবস্থাপনা না থাকলে নির্ভরশীল পরিবারের আয় ও স্থানীয় বাজার উভয়ের উপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। সভায় অংশ নেয়া কর্মকর্তারাও স্বীকার করেন, প্রশাসন একা যে কোনো বড় পর্যায়ের সমস্যা সমাধান করতে পারবে না — এজন্য স্থানীয় অংশগ্রহণ ও প্রশাসনিক সহায়তা দুটিই জরুরি।
মৎস্য রক্ষার এই উদ্যোগ বাস্তবে প্রয়োগ ও সফল হলে আগামী দু’বছরে চাঁদপুর এবং আশেপাশের নদীতীরবর্তী অঞ্চলে মাছের উৎপাদন ও বিক্রয় দুটোই খুলে যাবে বলে মৎস্য কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেন।