চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই সংঘটিত গৃহবধূ জাহেদা আক্তার মিশু হত্যার মামলায় আদালত মো. সুজন খান (৩১)-কে জাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন। রায়টি মঙ্গলবার (১৬ আগস্ট) দুপুরে চাঁদপুর সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ সামছুন্নাহার কক্ষে ঘোষণা করা হয়।
রায়ের পটভূমি এবং অভিযোগের সারসংক্ষেপ
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মিশু একই উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের একজনকে বিয়ে করেন। পরে তার স্বামী কাতারে চলে গেলে শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সঙ্গে তার বিরোধ দেখা দেয়। ওই বিবাদের প্রেক্ষিতে মিশুর মা ছালেহা বেগম মেয়েকে বাবার বাড়িতে নিয়ে আসেন। অভিযোগে বলা হয়, পূর্বশত্রুতার জেরে ২০১৯ সালের ভোরে চরমঘুয়া গ্রামের মিশু’র বাবার বাড়িতে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা করে সুজন। মিশুকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন; উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে মিশু মারা যান।
মামলার বাদী ছিলেন নিহতের মা ছালেহা বেগম। তিনি ঘটনার দিনই ফরিদগঞ্জ থানায় পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশের তদন্ত শেষে একই বছরের ৩১ জুলাই সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে ২০১৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
বিচারিক প্রক্রিয়া ও প্রমাণ
রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন পিপি কোহিনুর রশিদ। আদালত প্রসবের সময় মোট ২০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেছেন এবং নথিপত্র পর্যবেক্ষণ শেষে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় শাস্তি ঘোষণা করেন। অপর আসামিদের দুর্নীতিবিহীন প্রমাণের কারণে খালাস দেওয়া হয়েছে। আসামিপক্ষে মামলা পরিচালনা করেছেন আইনজীবী আমিন মিয়া খোকন।
রায় পড়ার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত সুজন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আদালত তাকে এক লাখ টাকার জরিমানা করা কি জরিমানার অর্থ অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব
ফরিদগঞ্জ উপজেলার চরমঘুয়া গ্রামের এই হত্যা ও দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া স্থানীয় মানুষের মধ্যে সন্দিহানতা ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করেছিল। যে পরিবারটি ক্ষতিগ্রস্ত, তার ওপর সামাজিক ও আর্থিক চাপ ছিল—এমন অভিযোগ বহুবার উঠেছে। আজকের রায় অনেকের কাছে ন্যায়বিচারের একটি পর্যায়শেষ হিসেবে দেখা হলেও পরিবারের ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন সংক্রান্ত কোনো তথ্য আদালতে আলোচিত হয়নি।
একাধিক থানায় সহিংস ঘটনাগুলো সম্পর্কে স্থানীয়রা তৎপর তদন্ত ও দ্রুত ন্যায়বিচারের আহ্বান জানিয়ে আসছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা আদালতের রায়ের স্বস্তি পেয়েছেন, তবে দীর্ঘ সময় ধেয়ে আসা মামলা ও বিচারে ক্ষত সেরে ওঠা সহজ নয় বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
ঘটনার সময়রেখা
| তারিখ | ঘটনা |
|---|---|
| ২০১৭ | জাহেদা আক্তার মিশুর বিয়ে |
| ২০১৯-০৭-২৯ | চরমঘুয়া গ্রামের বাবার বাড়িতে হত্যা ও মিশুর মৃত্যু |
| ২০১৯-০৭-৩১ | সুজনের গ্রেপ্তার |
| ২০১৯-১২-১৬ | অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল |
| ২০২৬-০৮-১৬ | চাঁদপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালত রায় ঘোষণা |
আইনি পরবর্তী ধাপ ও পরিবারিক প্রশ্ন
রায় ঘোষণার পর দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি উকিলের মাধ্যমে আপিল করার অধিকার রাখেন। মামলার অন্য চার বন্ধুর খালাস যেন নতুন কোনো কারণে আপিল বা পুনর্বিবেচনার নতুন দ্বার না খুলে, সেজন্য আপিল প্রক্রিয়া ও আদালতের বিবেচনা গুরুত্বপূর্ণ হবে। নিহত পরিবারের কাছে সামাজিক নিরাপত্তা, মানসিক সমর্থন ও আর্থিকভাবে সহায়তা নিশ্চিতের কোনো স্বতন্ত্র উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে কিনা—এ বিষয়ে পরে খোঁজ নেয়া হবে।
- মামলার মোট সাক্ষীর সংখ্যা: ২০ জন
- আসামির বিরুদ্ধে শাস্তি: জাবজ্জীবন ও ১ লক্ষ টাকা জরিমানা
- নির্বাহী নির্দেশ: জরিমানা অনাদায়ে ৬ মাস সশ্রম কারাদণ্ড
রায় সম্পর্কিত আরও তথ্য সংগ্রহ ও পরিবারের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা চলছে। চাঁদপুর থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে।