নড়াইল: চলতি বর্ষায় অবিরাম বৃষ্টিপাত এবং অপরিকল্পিত মাছের ঘের নির্মাণের কারণে নড়াইলে ব্যাপক পরিমানে আউশ ধান পানিতে ডুবে গেছে। জেলার নানান বিল ও ডোবায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘ দিন ধরে কায়েম থাকায় ক্ষেতের ধান পচে নষ্ট হওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা দাবি করছেন, তাদের মোট ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাসমূহ ও ফসলের অবস্থা
সরাসরি বিষয়টি যাচাই করতে গেলে দেখা যায়, লোহাগড়া উপজেলার লক্ষ্মীপাশা ইউনিয়নের আমাদার বিল, আন্ধারকোটা বিল, কুচিয়াবাড়ি বিলসহ জেলার বিভিন্ন বিল ও ডোবার নিচু জমিগুলোতে পানি এখন কোমর থেকে বুকসমান পর্যন্ত জমে আছে। বেশিরভাগ ক্ষেতেই ধানের বদলে দেখা যাচ্ছে শাপলা, শালুক ও জলজ আগাছা। কয়েকটি ফসলশূন্য জমিতে হাঁসের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে—যা ফসলের বরাবর এলাকার গভীর ক্ষতির প্রমাণ।
চাষিরা জানান, ওই নিচু জমিগুলোতে প্রচলিত ও পানি-সহনশীল জাত ‘রাতুল আউশ’ ধান চাষ করা হয়। গত বছর ধীরে ধীরে বৃষ্টিপাত বাড়ায় এই জাতের ফসল ভালো ফলন দিয়েছিল, ফলে এ বছরও কৃষকরা বৃহৎ পরিসরে আউশ চাষে আগ্রহী হয়েছিলেন। কিন্তু জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে অনবরত বৃষ্টিতে জমে থাকা পানি ও অপরিকল্পিত ঘের নির্মাণের ফলে ক্ষেতগুলো জলমগ্ন হয়ে যায় এবং গাছগুলো পচে নষ্ট হয়ে যায়।
কেন ক্ষতি বাড়ল: জলাবদ্ধতার কারণ
চাষিদের বক্তব্য অনুযায়ী বড় দুটি সমস্যা ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়েছে — এক, খাল-নালা ও নিষ্কাশন পথ অবরুদ্ধ করে মাছের ঘের নির্মাণ এবং দুই, খালের রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়া। তারা বলছেন, ঘের ও ভেড়ি নির্মাণের ফলে স্বাভাবিকভাবে জমে থাকা জল সহজে বের হতে পারছে না। ফলে কৃত্রিমভাবে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
“পানি বের হওয়ার পথ থাকলে এমন ক্ষতি হতো না। খালগুলো আটকে মাছের ঘের করায় পানি সরতে পারছে না। আউশ ধান সব পচে পানিতে শেষ হয়েছে।”
স্থানীয় চাষিরা দ্রুত নিকাশি ব্যবস্থা করে না হলে পরবর্তী আবহাওয়ায় আরো বড় ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তারা দাবি করেছেন, বিলের উপরের অংশের সামান্য ফসল বেঁচে গেলেও নিচু এলাকাগুলোর বেশিরভাগ ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। ফলে কৃষকেরা আর্থিকভাবে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছেন।
কেন্দ্রীয় তথ্য ও স্থানীয় দাবি
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ৯,১০৭ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ করা হয়েছিল। যদিও কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ক্ষয়ক্ষতি সীমিত বলে জানানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা তা প্রত্যাখ্যান করে বলছেন—বিলের নিচু অংশের ফসলগুলো মোটামুটি নষ্ট হয়েছে এবং ক্ষতির পরিমাণ যথেষ্ট বড়।
- ক্ষতিগ্রস্ত প্রধান ইউনিয়ন: লক্ষ্মীপাশা, বাঁশগ্রাম, নলদী, কোটাকোল, কলাবাড়িয়া, বাঐসোনা, পহরডাঙ্গা, খাশিয়াল, মাইজপাড়া, সেখহাটি।
- প্রাথমিক কারণ: টানা বর্ষা ও পানি নিষ্কাশন পথ অবরুদ্ধ হওয়া (অপরিকল্পিত মাছের ঘের)।
- চাষিদের দাবি: অবৈধ ঘের উচ্ছেদ, খাল-নালা পুনরুদ্ধার ও পুনঃখনন।
প্রভাব ও পরবর্তী করণীয়
চাষিদের ক্ষতি শুধুই আর্থিক নয়—ফসলশূন্য মরসুম শ্রমবাজার, স্থানীয় খাদ্য সরবরাহ ও উপার্জনের ওপর প্রভাব ফেলবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ঋণ, বীজ-সরঞ্জামের পুনঃক্রয় এবং সামনে আবাদ নিয়ে চিন্তায় পড়তে পারেন। দরকার হবে দ্রুত প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ—নৌপথে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা, অবৈধ ঘের উচ্ছেদ ও বিল-খাল পুনঃখনন করা যাতে পরবর্তী বর্ষায় এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| আউশ আবাদিত জমি | ৯,১০৭ হেক্টর |
| প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা | বিভিন্ন বিল ও ডোবা (লক্ষ্মীপাশা, আন্ধারকোটা, কুচিয়াবাড়ি ইত্যাদি) |
| চাষিদের দাবি | ঘের উচ্ছেদ, খাল-নালা পুনরুদ্ধার ও পুনঃখনন |
স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও এখনই তাঁদের ব্যাখ্যা লাগেনি; তবে আগের অভিজ্ঞতা থেকে দ্রুত নিকাশী ব্যবস্থা ও খাল উদ্ধারের ওপর গুরুত্ব না দিলে একই ধরনের ক্ষতি ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের দাবি দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে তাদের আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের ওপর মুহুর্তেই জোর দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেবে।
নড়াইলের গ্রামীণ অর্থনীতি ও স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বর্ষা-পর্বে পরিকল্পিত পরিবহন ও জলনির্মাণ ব্যবস্থার গুরুত্ব এবার আরও স্পষ্টভাবেই দৃশ্যমান হয়েছে। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কৃষকের এ ক্ষতি গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে—এটাই চাষিদের উদ্বেগ ও নিশ্চিত অনুরোধ।