নড়াইলের কালিয়া উপজেলার খাশিয়াল ইউনিয়নের বড়দিয়া-কালিয়া সড়কের দুই পাশে ২০২২ সালে রোপিত ১,৯৭১টি চারা এখন বহু গাছে পরিণত হয়েছে। একাত্তরের স্মৃতিকে ধরে রাখতে এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান বি এম বরকত উল্লাহ ও স্থানীয়রা। সময়ের সঙ্গে অনেক গাছ বেড়ে জরাগাছ হয়ে দাঁড়িয় আছে; কোথাও ফুল ফুটেছে, কোথাও ফল ধরেছে—এবং যেখানে ছায়া দরকার সেখানে পথচারীদের দিনটাও নরম হয়েছে।
বৃক্ষরোপণের উপযোগিতা ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া
রাস্তাটির দুই ধারে আজ দেখা যায় নানা প্রজাতির গাছ—বট, পাকুড়, অশ্বত্থ, শিমুল, কদম, বকুল, অর্জুন, জারুল, কৃষ্ণচূড়া, টগর, রক্তকরবী ও চেরি সহ বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছ। এছাড়া আমলকী, হরীতকী, বহেড়া, আমড়া, জাম, চালতা ও পেয়ারাসহ ঔষধি গাছও রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, গাছগুলো না থাকলে পুরো সড়কের দৃশ্যই ভিন্ন হত।
স্থানীয়দের কাছে এগুলো আর কেবল বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নয়—এগুলো এখন একটি জীবন্ত স্মৃতি। গ্রীষ্মের তাপে রাস্তায় ঘুরে ছায়ার তলায় মানুষ এসে বিশ্রাম নেন, আড্ডা দেন এবং স্মৃতিচারণ করেন। অনেকেই বলেন, বাড়ির কক্ষে যেভাবে শান্তি পাওয়া যায় না, এখানে গাছের ছায়া তাদেরকে স্বস্তি দেয়।
“তিন-চারজন বসে আছি। আরও লোক ছিল। এই যে গরম পড়ছে, কোথাও শান্তি নাই। ঠিকমতো বিদ্যুৎ থাকে না। এখানে এসে যে শান্তি পাই, বাড়িতে এসি রুমেও সে শান্তি পাওয়া যায় না,”
এ কথা বলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম (মুন্না)। তার মতো আরও অনেকে এই সড়কে গাছ থাকার ফলে নৈসর্গিক পরিবেশ ও সামাজিক সংযোগ ফিরে পেয়েছেন বলে জানান।
রোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণের পরিসংখ্যান
| বছর | রোপিত চারা | অতিরিক্ত সংযোজন |
|---|---|---|
| ২০২২ | ১,৯৭১ | — |
| ২০২৫ | — | ৬০০ চারা পুনরায় রোপণ |
প্রাথমিক রোপণ কার্যক্রমে স্থানীয় নেতৃত্ব, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও বিভিন্ন শুভানুধ্যায়ীর আর্থিক ও সাংগঠনিক সহায়তা ছিল। পরে কিছু গাছ নষ্ট হওয়ায় ২০২৫ সালে আরও ৬০০টি চারা রোপণ করা হয় এবং কিছু বাড়িতেও গাছ বিতরণ করা হয়েছে।
সড়ক-পরিবেশ ও জনজীবনে প্রভাব
সড়কের পাশের গাছগুলো পরিবেশগত ও সামাজিক দুদিকে প্রভাব ফেলছে। পরিবেশগত দিক থেকে গাছগুলো গরম কমাতে, ধুলা-বালু ধরে রাখতে এবং নিকটবর্তী এলাকার জীববৈচিত্র্য বাড়াতে সহায়ক। সামাজিকভাবে এগুলো স্থানীয় মানুষের মিলনস্থল হিসেবে কাজ করছে—বয়স্করা, যুবকরা ও পথচারীরা এখানে এসে বিশ্রাম নেন, আলোচনা করেন এবং স্মৃতিচারণ করেন।
- ছায়া ও স্বস্তি: দুপুরের তীব্র রোদে পথচারীদের বিশ্রামের স্থান।
- স্মৃতি সংরক্ষণ: একাত্তরের স্মৃতিকে প্রতীকীভাবে বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগ।
- প্রকৃতি ও ফল-ফুল: ফলদ ও বনজ গাছ স্থানীয় জীবিকা ও খাদ্য সরবরাহে ভূমিকা রাখছে।
তবে বৃক্ষরোপণের নিরবচ্ছিন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণে চ্যালেঞ্জও আছে। কয়েকটি গাছ নিরাপদে টিকে না থাকায় পরবর্তী পর্যায়ে পুনরায় চারা রোপণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসন ও ইউনিয়ন কমিটির ভূয়সী অংশগ্রহণ ছাড়া এই ধরনের উদ্যোগ টেকসই করা কঠিন বলে পরিবেশকর্মীরা মনে করেন।
খাশিয়াল ইউনিয়ন পরিষদের পরিকল্পনায় ওই সময় প্রতিটি ওয়ার্ডে ৭১টি করে বাড়িতে গাছ বিতরণ করা হয়েছিল—এতে পারিবারিক পর্যায়ে গাছের পরিচর্যা ও পরিবেশ সচেতনতার সূচনা হয়েছিল। যদিও সব গাছ টিকে না থাকার কারণ নিয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্যমত নেই, স্থানীয়রা বলছেন, স্থায়ী নজরদারি ও সঠিক জলের বন্দোবস্ত থাকলে অধিকাংশ চারা টিকে যেত।
বড়দিয়া-কালিয়া সড়কের গাছগুলো কেবল পরিবেশকেই উপকৃত করছে না—এগুলো স্থানীয় ইতিহাস ও স্মৃতিকে দৃশ্যমান করে তুলছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি সংরক্ষণের এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় ঐতিহ্য ও পরিবেশগত সচেতনতা জোরদার করে। আগামী দিনে এটি কিভাবে রক্ষা ও সম্প্রসারিত হবে, তা স্থানীয় প্রশাসন, কমিউনিটি ও নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের উপর নির্ভর করবে।