নদীজল কালো, মাছ শূন্য—স্থানীয়রা বলছেন স্থায়ী সমাধান নেই
নড়াইলের চিত্রা ও নবগঙ্গা নদীতে ব্যাপকভাবে পাট জাগ দেয়ার ফলে পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে। নদীর স্বচ্ছতা নষ্ট হয়ে কালো বর্ণ ধারণ করেছে; বহু বছর ধরে অব্যাহত পচনের কারণে নদীর মিষ্টি পানির দেশীয় মাছের ভাণ্ডার নিশ্চিহ্ন হওয়ার আশঙ্কা গুরুতরভাবে বেড়েছে।
নাগরিক ও মৎস্যজীবীরা জানান, রাশি রাশি পাট নদীতে ফেলে চলছে পচন প্রক্রিয়া এবং পচা পাটের প্রভাবে নদীর পানিতে অক্সিজেন শূন্যপন্থী অবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। জেলার কৃষকরা বলছেন, আগে পাট জাগ দেয়ার জন্য স্থানীয় ডোবা-নালা-খাল ছিল; কিন্তু পানি উৎস হারিয়ে যাওয়ায় তারা নদীকে ব্যবহার করছেন। ফলশ্রুতিতে নদীর তীরে থাকা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বিপন্ন মনে করছেন সকলে।
প্রভাব ও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি
সরাসরি প্রভাব দেখা দিচ্ছে মৎস্য সম্পদের উপর। প্রতিবেদন অনুযায়ী চিত্রা ও নবগঙ্গা নদী থেকে বিলীন হয়ে গেছে বেশ কয়েকটি দেশীয় মাছের প্রজাতি। স্থানীয়রা উল্লেখ করেন যে কয়েক ধরনের চিংড়ি ও মাছ—যেগুলো এক সময় নদীর গৌরব ছিল—এখন আর দেখা যায় না। জেলা প্রশাসকের কাছে সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাওয়া হয়েছে, তবে স্থানীয় জীবিকার ওপর প্রভাব ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে।
"পচা পানির দুর্গন্ধে নদী সংলগ্ন এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।"
কী কারণে সমস্যা বাড়ছে
- পাট জাগ দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত বন ও ডোবাসহ প্রাকৃতিক জলাশয় হারানো।
- উজানের পানি কমে যাওয়া—ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবের ফলে নদীর স্রোত ক্ষীণ।
- নদী তীরবর্তী শহরের ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশন সরাসরি নদীর সঙ্গে যুক্ত হওয়া।
সূত্রে বলা হয়েছে, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, প্রায় চার মাস ধরে নদীর মিষ্টি পানি মারাত্মকভাবে দূষিত থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এই দূষণ প্রবাহ অব্যাহত থাকায় পানিতে অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং কয়েক প্রজাতি ক্রমশ বিলুপ্তির পথে।
কোন প্রজাতিগুলো ঝুঁকির মধ্যে
সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী চিত্রা ও নবগঙ্গা নদীতে যে কিছু দেশীয় মাছ ও শেলফিশের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো নিম্নরূপ:
| ধরন | উল্লেখযোগ্য প্রজাতির উদাহরণ |
|---|---|
| চিংড়ি | গলদা, কাঁঠালিসহ কয়েক ধরনের চিংড়ি |
| মিষ্টি পানির মাছ | রিঠা, চেলেন্দা, চাপিলা, টাটকেনি, পদ্মবাউস, ভেটকি, বাতাসী, বাচা, সরপুটি, পাবদা, বোয়াল, আইড়, চিতল, রুই, কাতলাসহ অন্যান্য |
এই তালিকা সম্পূর্ণ নয়; তবে প্রতিবেদনে পাঠানো নামগুলোই স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির আভাস দিচ্ছে।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও চাহিদা
স্থানীয় মৎস্যজীবী ও গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, এখন নদীতে জেলে নৌকা কম দেখা যায় এবং জাল ফেলে মাছ ধরার দৃশ্য বিলীন হয়ে গেছে। নদীর পচা পানির দুর্গন্ধ ও দূষণের কারণে আশপাশের মানুষের শারীরিক ও অর্থনৈতিক জীবনেও প্রভাব পড়ছে। কেউ কেউ বলছেন, বন ও জলাশয়ের পুনরুদ্ধার ও পানির সঞ্চয়-সংরক্ষণ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না।
জেলা প্রশাসককে সংকট উত্তরণের উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হলেও এই মুহূর্তে চালু কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা গণমাধ্যমে বিস্তারিতভাবে জানানো হয়নি। স্থানীয়রা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থার দাবি করেন, যাতে নদীর মিষ্টি পানির খাদ্য- ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার সম্ভব হয় এবং কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে।
নড়াইলবাসীর জন্য প্রাসঙ্গিক প্রশ্নগুলো—কীভাবে পাট জাগ দেয়ার বিকল্প ব্যবস্থা করা হবে, হারানো জলাধারগুলো কীভাবে ফিরে আনা যাবে, এবং পানি সঞ্চয় ও বর্জ্য ব্যবস্থার সমন্বিত কর্মপন্থা কখন গ্রহণ করা হবে—এই প্রশ্নগুলোর জবাব ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান মেলানো কঠিন।