নড়াইল সদর উপজেলার দুটি দাখিল মাদ্রাসার কোনো পরীক্ষার্থীই এবার এসএসসি (দাখিল) পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি। জেলার অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফলাফল মিশ্র হলেও এই দুই মাদ্রাসার শূন্য পাসের বিষয়টি শিক্ষাব্যবস্থা ও স্থানীয় সমাজে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ভিত্তিস্বরূপ তথ্য
যশোর বোর্ডের প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, নড়াইল জেলা থেকে মোট ৮ হাজার ২৬২ জন পরীক্ষার্থী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেন। জেলায় মোট ৪০৪ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন — সাধারণ বোর্ডে ৩৭০, মাদ্রাসা বোর্ডে ১৬ এবং কারিগরি বোর্ডে ১৮ জন। কিন্তু জেলার মোট ১৮৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেবল এগিয়ে এসেছে ওই দুটি দাখিল মাদ্রাসা যেখানে পাসের হার শূন্য।
| প্যারামিটার | সংখ্যা |
|---|---|
| নড়াইল থেকে পরীক্ষার্থী | ৮,২৬২ |
| জেলায় জিপিএ-৫ | ৪০৪ |
| মাদ্রাসা বোর্ডে জিপিএ-৫ | ১৬ |
দুটি মাদ্রাসার পরিস্থিতি
টুলারামপুর ইউনিয়নের পেড়লী দাখিল মাদ্রাসাতে ১৭ জন শিক্ষকের বিপরীতে ১৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়; তাদের কেউই পাস করেনি। স্থানীয়ভাবে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৯৩ সালে এমপিওভুক্ত। বর্তমানে এখানে আনুমানিক ২৫০ জন শিক্ষার্থী ও ১৭ জন শিক্ষক কর্মরত আছে। মাদ্রাসার পাঠদান কার্যক্রম বহাল থাকলেও ফলনায়কতা শূন্য হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।
অপরদিকে, শেখহাটি ইউনিয়নের আফরা দাখিল মাদ্রাসা ভবনটি জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়া এবং সেখানে কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। মাদ্রাসাটির সুপার জানান, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি চালিয়ে আছেন, তবে এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এটি কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া
ফল নিয়ে হতাশ ও সংশয় রয়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে। মাদ্রাসার একজন শিক্ষার্থী তুষ্মি খানম বলেন, তিনি পাঁচম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছেন এবং বিভিন্ন সময়ে শ্রেণিকক্ষে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন; ইংরেজি পরীক্ষাও ভালো হয়েছে—তবুও ফলাফলে তাকে ফেল দেখানো হয়েছে। তিনি খাতা পুনর্নিরীক্ষণের (খাতা চ্যালেঞ্জ) আবেদন করবেন বলে জানিয়েছেন।
“আমি পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছি, সবসময় ক্লাসে রোল এক থাকে। ইংরেজি পরীক্ষাও অনেক ভালো দিয়েছিলাম, কিন্তু কেন ফেল দেখানো হলো বুঝতে পারছি না। খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করব, আশা করি ফল পরিবর্তন হবে।”
একজন অভিভাবক রুমা বেগম বলছেন, তার মেয়ে অত্যন্ত মেধাবী; পরীক্ষা দিয়ে এসে বলেছিল—পরীক্ষা ভালো হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, “সব শিক্ষার্থীকেই ফেল করানো হয়েছে। এটি কীভাবে সম্ভব?”—এমন প্রশ্ন পরিবেশে পুনরায় তদন্তের দাবি জোর দিলো।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের মন্তব্য ও পরিকল্পনা
পেড়লী দাখিল মাদ্রাসার সুপার আশরাফুল জামান ফল বিপর্যয়ের বিষয়টি মেনে নিলেও বলেছেন, অন্যান্য বছর ফল ভালো ছিল। তিনি জানিয়েছেন, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সম্মেলন করে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হবে এবং যেসব শিক্ষার্থীর ফলাফলে সন্দেহ আছে তাদের উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করা হবে। তিনি বলেন, শুধুমাত্র খাতা পুনর্নিরীক্ষণের পরে প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে।
প্রশাসন ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি প্রশ্ন
এই ঘটনাটি স্থানীয় প্রশাসন, মাদ্রাসা পরিদর্শক ও শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের মনোযোগ দাবি করছে। যেখানে একটি মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত থাকা সত্ত্বেও শতভাগ পাস হার থেকে শূন্যে নেমেছে, অন্যটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় কার্যত বন্ধ—এসব তথ্য মিলিয়ে বোঝা যায় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পর্যবেক্ষণ ও মানোন্নয়নে ব্যবধান আছে।
- পেড়লী দাখিল মাদ্রাসায় ১৮ পরীক্ষার্থী—কেউ পাস করেনি।
- আফরা দাখিল মাদ্রাসা জরাজীর্ণ, বহুদিন ধরে কার্যত বন্ধ থাকার ছবি।
- খাতা পুনর্নিরীক্ষণ ও অভিভাবক-শিক্ষক সমাবেশের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
স্থানীয়রা আশা করছেন—যশোর বোর্ড ও জেলা শিক্ষাবিভাগ দ্রুত তদন্ত করে যদি প্রয়োজন হয় খাতা পুনর্নিরীক্ষণ বা অন্যান্য সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার মান ও অবকাঠামোর সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা আনার প্রয়োজন রয়েছে যাতে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে শিক্ষার ফল পেতে পারে।