পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বেলুয়া নদীর তীরে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো কলাগাছের তৈরি ভেলা নিয়ে আয়োজিত ভেলাবাইচ প্রতিযোগিতা, যা জেলার গ্রামাঞ্চলে নতুন ধরনের উৎসব হিসেবে জনপ্রিয়তা সংগ্রহ করছে। শনিবার বিকেলে বেলুয়া নদীর দুই তীর জুড়ে প্লাবিত হয় আনন্দ; শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্করা এসে ভির জমিয়েছেন এ অনুষ্ঠান উপভোগ করতে।
গ্রামীণ মেলায় নতুন রূচি
এ ধরনের ভেলাবাইচের আয়োজন আগে নেছারাবাদসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে শুরু হলেও, নাজিরপুরে অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতা স্থানীয়দের জন্য এক আলাদা বিনোদন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিযোগিতায় মোট ৩২টি ভেলা নামেন; প্রতিটি ভেলায় দুজন করে মিলিয়ে মোট ৬৪ জন প্রতিযোগী অংশ নেন। প্রতিটি ভেলা দুটো কলাগাছের তৈরি—গড়ে ওঠা সহজ, নৌকাবিদ্যায় ইতিহাসবাহী নৌকার বদলে নতুন রকমের ক্রীড়া পরিবেশ তুলে ধরছে।
দর্শকসংখ্যা ও উৎসবমুখরতা
দুপুরের পর থেকে বিভিন্ন গ্রামের মানুষ নদীর তীরে ভিড় করেছেন; বাজার-ঘাট ও আশপাশের এলাকায় মেলা-সদৃশ পরিবেশ তৈরি হয়। স্থানীয়রা জানালেন, বরাবরের নৌকাবাইচের রীতি এখন আর দেখা যায় না—তাই কলার ভেলাবাইচ যেন সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে। তরুণ-যুবকেরা উদ্যোগ নিয়ে গ্রামবাসীর বিনোদনের জন্য এ অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে থাকে।
“এ ভেলাবাইচ কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি গ্রামীণ উৎসব ও সামাজিক মিলনমেলা,”
—অয়োজক কমিটির প্রধান শাহরিয়ার পারভেজ জয়ের কথাগুলো অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্যটি ব্যাখ্যা করে। তিনি বলেন, এলাকার যুবসমাজ এই উদ্যোগ নিয়েছে যাতে গ্রামের মানুষ একত্রিত হয় এবং হারিয়ে যাওয়া উৎসব পুনরুজ্জীবিত হয়।
প্রতিযোগিতার ফল ও পুরস্কার
প্রতিযোগিতায় স্থানীয় কিছু দলের পারফরম্যান্স দর্শকদের মন কাড়া করে। বিজয়ী ও ইনামপ্রাপ্তদের হাতে পুরস্কার তুলে দিয়েছেন কলারদোয়ানিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হাসনাত ডালিম। ফলাফলসমূহ সংক্ষেপে নিচে দেয়া হলো—
| অবস্থান | প্রতিযোগী |
|---|---|
| প্রথম | রমজান ও ফোরকান |
| দ্বিতীয় | হামিম |
| তৃতীয় | আলআমিন ও ইয়াছিন |
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া
উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে নাজিরপুর উপজেলা সদর থেকে আসা এক ছাত্রনেতা রায়হান প্রিন্স জানান যে, তিনি নৌকাবাইচ সাধারণত বড় বিশেষ উপলক্ষ ছাড়া দেখতে পেতেন না। প্রথমবারের মতো ভেলাবাইচ দেখার অভিজ্ঞতা তাকে মুগ্ধ করেছে।
“এখানে ভেলাবাইচ অনুষ্ঠিত হবে শুনে দেখতে এসেছি। দেখে খুবই ভালো লাগল। এর আগে কখনো ভেলাবাইচ দেখিনি। এবারই প্রথম দেখলাম,”
স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিযোগিতা কেবল ক্রীড়া নয়—এটি গ্রাম্য সাংস্কৃতিক মিলন এবং পাড়া-মহল্লার মিলনের ক্ষেত্র। সকালের প্রস্তুতি থেকে রাতে পুরস্কার বিতরণ পর্যন্ত পুরো এলাকায় উৎসবমুখর কার্যক্রম চলে।
ভবিষ্যৎ—ধারা বহাল রাখার লক্ষ্য
অনুষ্ঠানের আয়োজকরা জানালেন, এ ভেলাবাইচকে ধারাবাহিক করতে তারা কাজ করে যাবেন। পুরস্কার বিতরণ ও সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও বহু গ্রাম থেকে টিম আনার পরিকল্পনা আছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইউনিয়নের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ—এদের মধ্যে ইউনিয়ন বিএনপি আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম উজ্জ্বল, সদস্য সচিব মাহাবুবুর রহমান শানু ও যুবদল নেতা মিজানুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
গ্রামীণ জীবনের এই নতুন ধরনের মেলাধর্মী অনুষ্ঠান স্থানীয় ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও যুবসমাজের সৃজনশীল অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করছে। যে উৎসাহ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ দর্শক উপস্থিত ছিল, তা থেকে সুস্পষ্ট যে ভেলাবাইচ নাজিরপুরে কেবল একটি খেলা নয়—ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধন টিকিয়ে রাখা একটি মাধ্যম হিসেবে 자리 করে চলেছে।
- স্থান: নাজিরপুর, বেলুয়া নদীর তীর
- অংশগ্রহণকারী: ৩২ ভেলা, ৬৪ জন প্রতিযোগী
- উদ্বোধনী বক্তব্য ও পুরস্কার: কলারদোয়ানিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হাসনাত ডালিম