পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে মানুষের সঙ্গে ক্রমাগত সংঘাতের মুখে এশীয় মহাবিপন্ন প্রজাতি বুনো হাতি চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বনভূমি ধ্বংস, তীব্র খাদ্য ও পানির সঙ্কট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে হাতির চলাচলের প্রাচীন করিডোরগুলো ভেঙে পড়ার ফলে লোকালয়ে বাহিরে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাতির দল।
হার বেশি, সংখ্যা কমে আসছে
বন বিভাগের তথ্যে দেখা যায়, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, বন উজাড় ও বিদ্যুতায়িত ফাঁদ ইত্যাদির কারণে গত দেড় দশকে রাঙ্গামাটির পাহাড়ে অন্তত ১৩টি হাতি মারা গেছে। এর মধ্যে গত দশ বছরে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৮–১০টি হাতি। একই সময়ে মানুষ ও হাতির সংঘাতে অন্তত ৩৬ জনের প্রাণও যেতে হয়েছে। বর্তমানে পুরো রাঙ্গামাটিতে মোট গড়ে মাত্র ৪০–৫০টি হাতি অবশিষ্ট বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক ভিন্নতা ও করিডোরের ভাঙন
পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী কাপ্তাই অঞ্চলে প্রায় ৩৬টি হাতি কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে ঘোরে। অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের তথ্য বলছে লংগদু ও বরকল এলাকায় ১২–১৫টি হাতি সক্রিয় রয়েছে, যা বড় অংশে ভাসান্যাদম ইউনিয়নের কিছু এলাকায় অবস্থান করছে।
হাতির চলাচলের ঐতিহ্যবাহী করিডোরগুলো বিচ্ছিন্ন হওয়ার মূল কারণগুলো হিসেবে বন উজাড়, পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ, পর্যটন কেন্দ্র গঠন এবং অনিয়ন্ত্রিত বসতি-প্রসারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। কৃত্রিম বনায়ন (সেগুন বা ইউক্যালিপটাস) এবং প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের ক্ষতি হাতির প্রধান খাদ্য উৎস নষ্ট করেছে। শীত ও শুকনো মৌসুমে পাহাড়ি ঝরনাগুলো শুকিয়ে গেলে পানিপ্রশ্ন বাড়ে এবং হাতিরা পানির খোঁজে লোকালয়ে আসে, যেখানে তাদের সঙ্গে সংঘাতের ঘটনা বাড়ে।
স্থানীয় উদ্যোগ ও চ্যালেঞ্জ
একটি স্থানীয় উদ্যোগ হিসেবে লংগদু উপজেলায় ২০২২ সালে বনবিভাগের সহযোগিতায় গড়ে তোলা হয়েছে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি)। ইআরটিতে স্থানীয়দের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল আছে, যাদের কাজ হাতি লোকালয়ে এলে মানুষকে সচেতন করা, হামলা-মামলা ঠেকিয়ে হাতিদের বনাভূমিতে ফিরিয়ে দেওয়া এবং অসুস্থ হাতির খবর বনবিভাগকে জানানো।
“আমাদের সংগঠনে ১৮ জন সদস্য রয়েছেন। আমাদের প্রধান কাজ হাতিকে রক্ষা করার জন্য মানুষকে সচেতন করা। আমরা দিনরাত মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব নিরসনে কাজ করে চলেছি।”
এই দলের এক সদস্য মাইনুল ইসলাম জাগো নিউজকে উপরের কথাগুলো বলে জানান। তাদের কাজ লোকালয়বাসীকে হাতির উপস্থিতি সম্পর্কে জানানো এবং সহিংসতা এড়িয়ে হাতিদের বনে ফিরিয়ে নেয়া—তবে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও সমন্বয়হীন নীতি-পরিকল্পনা বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে রয়েছে।
অবকাঠামো ও উন্নয়নের প্রভাব
পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ, পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন ও নিয়ন্ত্রিত নীতিমালা ছাড়া বসতি গড়ার ফলে হাতির চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুতায়িত ফাঁদ ও শিকারও হাতির মৃত্যু বাড়িয়েছে। এসব কার্যক্রম হাতির খাদ্যাভাস ও প্রজনন চক্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, ফলে প্রাকৃতিক ভাবে হাতির সংখ্যা পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়ছে যদি না সময়ে সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
- প্রধান কারণ: বন উজাড়, করিডোর ভাঙা, কৃত্রিম বনায়ন, পানি-সংকট
- প্রভাব: মৃত্যু বাড়া, লোকালয়ে আক্রমণ, ফসল ক্ষতি, জনগণ নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছে
- উত্তরদায়িত্ব: বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও সম্প্রদায়ের সমন্বয় প্রয়োজন
স্থানীয়দের উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা
হাতি-মানুষ সংঘাতের ধারাবাহিকতা জনজীবনে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। কৃষকরা ফসল রোপণের সময় উদ্বিগ্ন; শিশুরা বাইরে খেলতে কম যায়; রাতে কিছু এলাকায় মানুষ নিরাপত্তার কারণেই বাইরে যেতে কষ্টে পড়েন। অপরদিকে হাতি যেসব সময় লোকালয়ে চলে আসে সেগুলোতে হাতির খাওয়ার সমস্যাও প্রকট—তাই উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত।
কী করা উচিত — প্রাসঙ্গিক পরামর্শ
বন বিভাগের রিপোর্ট এবং স্থানীয় উদ্যোগগুলো থেকে স্পষ্ট যে সমস্যা সমাধানে একাধিক স্তরে উদ্যোগ নেয়া দরকার: করিডোর পুনরুদ্ধার, স্থানীয় হিসাবে বন রিক্যানোরেশন করলে উপযোগী প্রাকৃতিক খাদ্যরোপণ, ইআরটি’র ক্ষমতা বৃদ্ধি ও বড় পরিসরে সমন্বিত পরিকল্পনা। জনগণকে সচেতন করে সহিংসতা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগকে ধারাবাহিক নির্দেশনা জারি করতে হবে।
রাঙ্গামাটির পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষায় এই সংকটকে স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদী পদ্ধতিগত পরিকল্পনা ও অর্থায়ন জরুরি। নতুবা বুনো হাতির অস্তিত্ব সঙ্কট থেকে আর বের হওয়া কঠিন হবে—মানুষের নিরাপত্তাও বিপন্ন থাকবে।