বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠি এলাকার পালপাড়ায় বুধবার বিকেল—মেঘে ঢাকা আকাশের নীচে ছোট্ট এক কর্মশালায় একমাত্র বৈদ্যুতিক বাতি মিটমিট করছে। মাটির সারি সারি ঘট পাথরের মতো সাদা। ছাঁচে তৈরি, খড়িমাটির প্রলেপে ঢাকা বা হলুদ রং লেগে দেবী মনসার প্রথমআকৃতি পেয়েছে। মাটি, তুলি ও রঙের মাঝে বসে আছেন ৩৫ বছর বয়সী মৃৎশিল্পী সমীর পাল।
পারিবারিক সংরক্ষণ—কমে এসেছে কর্মী
একসময় কলসকাঠি পালপাড়ায় প্রায় প্রতিটি পরিবারই মনসাঘট তৈরি করত। এখন সেই তালিকা প্রায় বিলীন। স্থানীয়রা জানান, এলাকার প্রায় ২০ পাল পরিবারের মধ্যে এই কাজটি বর্তমানে একমাত্র সমীর পালন করছেন। তাঁর কাজের ধারা, কৌশল ও নকশা—সবই বাবার কাছ থেকেই শিখেছেন। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় নারায়ণ চন্দ্র পালের কাছে কাজ শিখেছেন সমীর; পড়াশোনার ফাঁকে বাবাকে সাহায্য করতেন। বাবার মৃত্যুর পরে প্রায় পনেরো বছর আগে তিনি পুরো দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
মনসাপূজার প্রাসঙ্গিকতা ও বরিশালের বৈশিষ্ট্য
বাংলার লোকবিশ্বাসে মনসা সর্পদেবী হিসেবে বিবেচিত। বর্ষাকালে সাপের আক্রমণ থেকে রক্ষা, পরিবারের মঙ্গল ও উর্বরতা কামনায় মনসাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। বরিশাল অঞ্চলে মনসাপূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মনসামঙ্গল কাব্য ও কবি বিজয় গুপ্তর স্মৃতি। স্থানীয়ভাবে বরিশালের ঘটগুলোর বিশেষত্ব হলো এগুলোতে পবিত্রতা ও উর্বরতার প্রতীকী ধারণা ঢুকানো হয়; ঘটের আকৃতিতে ও নকশায় এই ভাবগুলো স্পষ্ট দেখা যায়।
সমীরের দিনযাপন ও পরিবারের অবস্থা
সমীরের পরিবারের সদস্যরা হলেন স্ত্রী অনিমা, এক বছর ছয় মাস বয়সী মেয়ে শ্রেয়সী এবং বৃদ্ধ মা পুষ্প রানী। তিনি HSC পাস করেছেন, কিন্তু পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে পুরোপুরি মৃৎশিল্পে নিজেকে যুক্ত করেছেন। এখন মনসাপূজা সামনে থাকায় বিশেষভাবে ব্যস্ত সময় পার করছেন—ঘট তৈরির ছাঁচ, মাটি প্রস্তুত, প্রলেপ-রং সবকিছুই সমীরের তত্ত্বাবধানে চলছে।
কর্মপদ্ধতি ও স্থানীয় সহযোগিতা
কলসকাঠি কর্মশালায় দেখা যায়—কোনো জায়গায় কাঁচা মাটি প্রস্তুত করা হচ্ছে, অন্যত্র ছাঁচে ঘট তৈরি হচ্ছে। নারী-পুরুষ, শিশু-দেখতে পাওয়া যায় সবাইকে কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত। কেউ মনসার প্রতিমা গড়ছেন, কেউ লক্ষ্মী বা সরস্বতীর মূর্তি গড়ছেন; তবে সারিবদ্ধভাবে এ এলাকার ঘরে ঘরে মনসাঘটের সারি চোখে পড়ে। বর্ণনা অনুযায়ী, এই কাজ এখনো স্থানীয় মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের সঙ্গে সংযুক্ত।
চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ
এতকিছুর পরও উদ্বেগ রয়েছে—এক একলব্য মৃৎশিল্পীকে নিয়ে ঐতিহ্যের গুরুত্ব ও টেকসইতা কতটা ধরে রাখা যাবে, সন্দেহ আছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে শিল্পটি তেমন আগ্রহ পায়নি; শিক্ষা ও শহরায়ন কার্যত পরিবারগুলিকে ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। পাশাপাশি কাঁচামালের খরচ, বাজারে কম দাম ও প্রতিযোগিতার চাপ মৃৎশিল্পীদের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে।
স্থানীয় উদ্যোগ ও সচেতনতা
স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ও চারুকলা মাঠেও কাজ চলছে—মাটি ও গ্রামীন শিল্পকে সংরক্ষণে নানা উদ্যোগ নেয়া উচিত বলে সুশান্ত ঘোষ, সংগঠক "বরিশাল চারুকলা—যেখানে মাটি কথা বলে"-র হয়ে উল্লেখ করেছেন। সম্প্রদায়ভিত্তিক প্রদর্শনী, শিক্ষা কার্যক্রম ও স্থানীয় পর্যটন প্রচার এই শিল্পকে প্রাণ দিতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| শিল্পীর নাম | সমীর পাল |
| বয়স | ৩৫ |
| শিক্ষাগত যোগ্যতা | এইচএসসি পাস |
| পরিবার | স্ত্রী অনিমা, মেয়ে শ্রেয়সী (১.৫ বছর), মা পুষ্প রানী |
| পাল পরিবার সংখ্যা (কলসকাঠি) | ২০ (এখানে ঘট তৈরিতে বর্তমানে একাই কাজ করছেন) |
প্রস্তাবিত সহায়তা ক্ষেত্র
- স্থানীয় পর্যায়ে প্রদর্শনী ও বাজার ব্যবস্থা করে মৃৎশিল্পীদের বিক্রয় নিশ্চিত করা।
- প্রশিক্ষণ ও কর্মবাজার সংযোগ করে তরুণদের আকৃষ্ট করা।
- কাঁচামালের সঙ্কট ও দাম নিয়ন্ত্রণে সমবায় বা সহযোগিতা গড়ে তোলা।
কলসকাঠির ছোট্ট কর্মশালায় তুলি ও রংয়ের আওয়াজে এখনো জীবিত আছে মনসাপূজার ঐতিহ্য। তবে এই ঐতিহ্য টিকে থাকতে চাইলে স্থানীয় উদ্যোগ, সামাজিক সমর্থন ও নীতিগত মনোযোগ প্রয়োজন। না হলে একদিন এই পালপাড়ার নাম স্মৃতিতেই বেঁচে থাকবে—ঘট তৈরি করত যারা, তাদের ছায়া মিলিয়ে যাবে।
সমাপ্তি