বরিশাল পুলিশ লাইন্সে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় বরিশাল রেঞ্জের নবাগত ডিআইজি মো. জুলফিকার আলী হায়দার পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও আইনশৃঙ্খলার বর্তমান চিত্র নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তিনি সরাসরি জানিয়েছেন যে পুলিশের মধ্যে আচরণগত দুর্বলতা ও সহমর্মিতার অভাব আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
“পুলিশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো আচরণগত সমস্যা ও সহযোগিতামূলক মনোভাবের ঘাটতি”
ডিআইজি বলেন, দরিদ্র বা বিপদগ্রস্ত কোনো ভুক্তভোগী যখন থানায় সাহায্য চান, তখন পুলিশ সদস্যদের মানবিক এবং সহানুভূতিশীল আচরণ থাকা জরুরি। অনেক ঘটনায় কনস্টেবল ও ডিউটি অফিসারসহ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে সেই মনোভাব দেখা যায় না—ফলত: সাহায্যপ্রার্থীর ভরসা ভেঙে যায় এবং অপরাধ-জিজ্ঞাসা বা অভিযোগ দায়ের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
সমস্যা ও সমাধানে পরিকল্পনা
আচরণগত ঘাটতি সমাধানে রেঞ্জ কমান্ডের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে ডিআইজি জানান। তার আলোচ্য পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আচরণগত পরিবর্তন আনা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিজস্ব আচরণের মাধ্যমে অধস্তনদের জন্য মডেল তৈরি করা। তিনি সাংবাদিকদের প্রতি পুলিশের দরজা সবসময় খোলা রাখার কথা জানিয়েও বলেছেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গঠনমূলক সমালোচনা ও পরামর্শ দরকারেই।
- প্রশিক্ষণ উদ্যোগ: পুলিশ সদস্যদের আচরণগত পরিবর্তনে নিয়মিত প্রশিক্ষণ।
- কমিউনিটি পুলিশিং: স্কুল-কলেজ ও স্থানীয় স্তরে সচেতনতা কর্মসূচি এবং কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করা।
- সাংবাদিক সহযোগিতা: মাঠপর্যায়ের তথ্য ভাগ করে আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নের অনুরোধ।
ডিআইজি জুলফিকার আলী হায়দার বক্তৃতায় বলছেন, পুলিশ একাই আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম নয়—জনগণের সহযোগিতা অপরিহার্য। তিনি সাংবাদিকদের কাছে তথ্যমুখী সহায়তার আবেদন জানিয়ে বলেন, মিডিয়া ও পুলিশ যদি হাতে হাত রেখে কাজ করে তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত উন্নত করা সম্ভব।
অপরাধের ধরনে পরিবর্তন ও স্থানীয় উদ্বেগ
আচরণগত সমস্যা ছাড়াও ডিআইজি হাইলাইট করেছেন যে প্রচলিত অপরাধের পাশাপাশি ডিজিটাল প্রতারণা, অনলাইনভিত্তিক অপরাধ ও মাদক সেবন বেড়ে চলেছে। কিশোর গ্যাং এবং বর্ষাকালে ডাকাতির ঘটনা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সমাজে বদলে যাওয়া প্রযুক্তিগত ব্যবহারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুলিশি ব্যবস্থা আধুনিকীকরণের প্রয়োজন রয়েছে—বিশেষত সাইবার অপরাধ অনুসন্ধান ও প্রতিহত করার ক্ষেত্রে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত ডিআইজি ড. মো. সাইফুল্লাহ বিন আনোয়ার, মো. হুমায়ুন কবির, বরিশাল পুলিশ সুপার এ। জেড। এম। মোস্তাফিজুর রহমান এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম খসরু।
| উল্লেখযোগ্য বিষয় | উদ্দেশ্য/আবশ্যকতা |
|---|---|
| আচরণগত পরিবর্তন | ভুক্তভোগীর প্রতি সহানুভূতি ও পরিবেশ বান্ধব সেবা নিশ্চিত করা |
| প্রশিক্ষণ | আচরণগত মান উন্নয়ন ও আধুনিক অপরাধ মোকাবিলা দক্ষতা প্রদান |
| কমিউনিটি পুলিশিং | স্থানীয় সচেতনতা বাড়ানো এবং স্কুল-কলেজ পর্যায়ে মাদক ও অপরাধ প্রতিরোধ |
| সাংবাদিক সহযোগিতা | মাঠ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ভাগ করে নেয়া ও নীতি নির্ধারণে সহায়তা |
ডিআইজি অফিসের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য থেকে পরিষ্কার হয় যে বিষয়গুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন প্রত্যাশিত হলেও এগুলো সময়সাপেক্ষ এবং স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য ধারাবাহিক প্রচেষ্টা দরকার। পুলিশ প্রশাসনকে অবশ্যই কেবল শৃঙ্খলা বহাল রাখাই নয়, নাগরিক সেবা ও আস্থা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
সরকারি উদ্যোগ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি যত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে স্থানীয় জনগণের উপর তার ইতিবাচক প্রভাব তত দ্রুত পড়বে—বিশেষত প্রত্যন্ত ও দরিদ্র অঞ্চলের মানুষদের কাছ থেকে পুলিশে অভিযোগ আনার ঝুঁকিও কমবে। এই প্রয়াসে সাংবাদিক সমাজকেও সক্রিয়ভাবে তথ্য-ভিত্তিক পরিবেশন ও সমালোচনা চালিয়ে যেতে ডিআইজি অনুরোধ জানিয়েছেন।
বরিশাল রেঞ্জের এই নতুন নির্দেশনা ও পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনবে তা সময় বলবে; তবে সচেতনতা, প্রশিক্ষণ এবং সমাজ-সাংবাদিক সমন্বয় জোরদার হলে পুলিশের সেবা গ্রহণে সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।