বরিশাল: গত এক মাস ধরে বরিশাল মহানগরী ও আশপাশের জেলা—উপজেলা ও ইউনিয়নে ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুতের বিচ্ছিন্নতা জনজীবনে প্রতিদিনই নতুন সংকট সৃষ্টি করছে। স্থানীয়রা বলেন, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিশ্চিত থাকার ফলে যোগাযোগ, শিক্ষা, ব্যবসা ও স্বাস্থ্য সেবায় ব্যাপক বিঘ্ন ঘটে।
লোডশেডিং ও সরবরাহ ঘাটতি
স্থানীয় সূত্র জানায়, জাতীয় গ্রিড থেকে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে মোটপ্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকলেও অঞ্চলটিতে সাধারণ চাহিদার মাত্রা পূরণে তা পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে এই অঞ্চলের চাহিদার আনুমানিক সাড়ে ৮শ' মেগাওয়াট-এর কাছাকাছি হলেও সরবরাহ তা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। গত মাসিক বিচারে দৈর্ঘ্যভিত্তিক ও অনির্দিষ্টকালীন লোডশেডিং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করেছে।
জনজীবনে প্রভাব
বিদ্যুৎহীনতার ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও পরীক্ষা প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। চলতি মাসে স্থানীয় পর্যায়ে উপস্থিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক ছাত্র-ছাত্রী বিদ্যুৎ সংকটের কারণে পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে পিছিয়ে পড়ছেন।
স্বাস্থ্য খাতে প্রভাবও জোরালো। অনেক হাসপাতালের জরুরি অস্ত্রোপচারের কার্যক্রম বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার কারণে স্থগিত বা সীমিত হতে বাধ্য হচ্ছে। পানি সরবরাহও লাইনচ্যুত হওয়ায় নগরীর অন্তত ২৫টি পৌর এলাকায় পানিসংক্রান্ত বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি ও নিরাপত্তাহীনতা
দীর্ঘ সময় স্থগিত বিদ্যুৎ সরবরাহে শপিংমল, দোকান ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গৃহীত ক্ষতির মুখে রয়েছে। মাঝারি ও ছোট শিল্পখাতের কার্যক্রম ব্যহত হওয়ায় কর্মহীনতার ঝুঁকিও বাড়ছে। রাতের অন্ধকারে নিরাপত্তাহীনতা তীব্র—বহু এলাকায় রাতের পর ট্রান্সফরমার ও বিদ্যুতের তার চুরি হচ্ছে, যা বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাকে উদ্বিগ্ন করেছে।
- লোডশেডিংয়ের সুযোগে সরঞ্জামচুরি এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ বেড়েছে।
- পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট পুনরায় উৎপাদনে ফিরে আসায় জাতীয় গ্রিডে ৬৬০ মেগাওয়াট যোগ হয়েছে, তবু সমস্যা মিটছে না।
- দেশীয় পর্যায়ে সরবরাহ-বিতরণ দুর্বলতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসা।
চাঁদাবাজি ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ
স্থানীয় সংবাদবিবরণী ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ রেকর্ড অনুযায়ী, লোডশেডিং ও সরবরাহ বিভ্রাটকে কেন্দ্র করে কিছু এলাকায় চাঁদাবাজির ঘটনাও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি দলের জনপ্রিয়তাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে—গত নির্বাচনে বরিশালের ২১টি আসনের মধ্যে ২০টিতে সরকারি দলের প্রার্থীরা জিতেছিলেন, যার ১৯টি আসন বিএনপি’র। কিন্তু ক্ষমতায় এসে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে এই সংকট স্থানীয় আস্থাকে নড়বড়ে করেছে বলে উৎসগুলো তুলে ধরেছেন।
"অবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় সাধারণ মানুষের নিত্যজীবন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা বিপর্যস্ত হচ্ছে,"—স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং চুরি রোধে স্থানীয় বিতরণ সংস্থা মাইকিং করে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা চেয়েছে। একই সঙ্গে ট্রান্সফরমার ও লাইন রক্ষায় স্থানীয় পর্যায়ে তদারকির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। তবে বর্তমান উৎপাদন বৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং চোরাচালানের কারণে সমস্যা টালাগাছার মতো বারবার ফিরে আসছে।
| বিষয় | অবস্থা/আকর |
|---|---|
| জাতীয় গ্রিড যোগান | প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট |
| অঞ্চলের চাহিদা (আনুমানিক) | প্রায় সাড়ে ৮শ' মেগাওয়াট |
| নতুন যোগান | ৬৬০ মেগাওয়াট (পায়রা তাপ কেন্দ্রের একটি ইউনিট) |
| সংকটের মেয়াদি প্রভাব | শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি সরবরাহ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত |
পড়শি জেলা ও সাধারণ মানুষ কী চান
স্থানীয়রা চাই দ্রুত ও ধারাবাহিকভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করা, চোরাচালান ও চাঁদাবাজি রোধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সহায়তা প্রদান। শিক্ষার্থীরা স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ না হলে পরীক্ষার প্রস্তুতি ও অনলাইন/রাত্রীভোজন কার্যক্রম বজায় রাখা কঠিন হবে বলে জানান শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা।
বরিশালের এই বিদ্যুৎ সংকট স্থানীয়ভাবে বিশাল প্রভাব ফেলছে—ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থায়। সমস্যা সহজে সমাধান না হলে দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব বাড়বে, যা স্থানীয় নেতৃত্ব ও প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
মনিরুজ্জামান খান, বরিশাল প্রতিনিধি, WE NEWS