হবিগঞ্জে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট নতুন মাত্রায় এসে পৌঁছেছে। চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকেই অঞ্চলটিতে গ্যাস সরবরাহ সীমিত করা হচ্ছিল; কিন্তু গত বুধবার (১২ আগস্ট) থেকে জেলা জুড়ে বেশিরভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এতে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭১টি কারখানার কার্যক্রম বন্ধ পড়েছে।
ক্ষতির ধরণ ও কর্মীর অবস্থা
শিল্প মালিকদের দাবি, গ্যাস নিলে প্রতিদিন তাদের কোটি টাকার উৎপাদন চলত; গ্যাস না থাকায় দৈনিক বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন উদ্যোগপতিগণ। বহু প্রতিষ্ঠান রপ্তানিমুখী হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ না করতে পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে বড় অর্ডার হারানোর শঙ্কাও রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস না থাকায় কারখানার ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টও চালু করা যাচ্ছে না; ফলে নিজস্ব শক্তির বিকল্প নেই বলে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
শ্রমিক ও কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছে কনফিউশন ও উদ্বেগ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাস সংকটের জেরে এখন জেলা জুড়ে লক্ষাধিক মানুষ—কখনও ‘‘দেড় লক্ষাধিক’’ হিসেবে এবং কোথাও ‘‘লক্ষাধিক’’ হিসেবে বলা হয়েছে—অলস সময় কাটাচ্ছেন। যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) আবুল হোসেন একথা নিশ্চিত করে বলেন:
‘আমাদের এখানে মোট ছয়টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে টায়ার, স্পিনিং, ফেব্রিক্স, পেপার, পলি সিল্ক ও পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে। এগুলোর মধ্যে টায়ার এবং পাওয়ার প্ল্যান্ট বাদে সবগুলোই শতভাগ রপ্তানিমুখী।’
এক প্রতিবেদনে আবুল হোসেন আরও জানিয়েছেন, তাদের কারখানাগুলোতে কর্মরত দেড় হাজারের বেশি নয়—বরং কোম্পানির বিবরণ অনুযায়ী শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে মোট ১২ হাজার জন রয়েছেন এবং সবারই এখন কার্যত বেকার অবস্থায় পড়ার কথা। তিনি এ সময় দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ‘প্রায় শতকোটি টাকা’ হিসেবে আঙুলে তোলা মাত্রায় বর্ণনা করেছেন।
সরবরাহ ভিন্নতা ও বৈষম্যের অভিযোগ
স্থানীয় শিল্পপার্ক ও উদ্যোক্তারা বলছেন, একই এলাকায় কিছু প্রতিষ্ঠানকে গ্যাস সরবরাহ চালু রেখে অন্যগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হচ্ছে—যার ফলে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। তারা দাবি করেছেন, যদি পরিস্থিতি জাতীয় কারণবশত তৈরি হয়, তাহলে সমতা বজায় রেখে নীতিমালা প্রয়োগ হওয়া উচিত।
- জেলায় মোট বন্ধ কারখানা: ১৭১
- সম্পূর্ণ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান: অর্ধশতাধিক
- কর্মরত শ্রমিক-কর্মকর্তা (যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক): ১২ হাজার
গ্যাস কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ও সম্ভাব্য সমাধান
গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, এই সংকটটি একটি জাতীয় স্বরূপের সমস্যা; বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় শিল্পখাতে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
তবে শিল্প মালিকরা বলছেন, জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ বা বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার (যেমন সুশৃঙ্খল জেনারেটর চালনা বা অন্য উৎসের ব্যবস্থা) বিষয়ে অবিলম্বে সরকারি উদ্যোগ না নিলে রপ্তানি চেইন ও কর্মসংস্থান দুটোই বড় ধরনের ধাক্কা পাবে।
স্থানীয় বাজার ও রপ্তানিতে প্রভাব
স্বাধীন ও রপ্তানিমুখী খাতগুলোতে উৎপাদন বন্ধ থাকায় বাজারে সরবরাহ চেইনে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও স্পিনিং সেক্টরের প্রতিষ্ঠানগুলোতে ডেলিভারি মিস হলে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প সরবরাহকারীর দিকে চলে যেতে পারেন—ফলস্বরূপ ভবিষ্যৎ অর্ডারও কমে যেতে পারে।
| বিষয় | অবস্থা / সংখ্যা |
|---|---|
| বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান | ১৭১ |
| শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান | অর্ধশতাধিক |
| যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে কর্মী | ১২,০০০ |
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে এখন দ্রুত তথ্যভিত্তিক সমন্বয় সূত্রে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে নির্দেশনা প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের কাছে জরুরি বরাদ্দ, ভ্যাট-সংক্রান্ত সহায়তা বা নগদ ব্যবস্থাপনার মতো সহায়তা চাওয়া শুরু করেছে—যা না পেলে ক্ষতির মাপ সামলানো কঠিন হবে বলে তাদের আশঙ্কা।
হবিগঞ্জের শিল্পখাতের সচলতা কবে স্বাভাবিক হবে তা গ্যাস সরবরাহকারী ও বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও পুনর্বন্টনের উপর নির্ভরশীল। স্থানীয় উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও ক্রেতাদের মধ্যে এখন উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার জাল বিস্তৃত।