হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসে ছাত্রী-ছাত্রদের মধ্যে গত ১৯ আগস্ট রাতে সংঘটিত মারামারি ও আহতির ঘটনায় কলেজ প্রশাসন আট শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন সময়সীমায় একাডেমিক কার্যক্রম এবং ছাত্রাবাস থেকে বহিষ্কার করেছে। ঘটনায় গুরুতরভাবে আহত এক শিক্ষার্থী বর্তমানে ঢাকায় চিকিৎসাধীন আছেন এবং তার একটি চোখ নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে—এই তথ্য অফিস আদেশে উল্লেখ আছে।
ঘটনার সময় ও তদন্তক্রম
আদেশ অনুযায়ী, সংঘর্ষ ঘটেছিল ১৯ আগস্ট দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে বারটার সময় ছাত্রাবাস-১-এ। ঘটনার পর পরদিন (২০ আগস্ট) কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলের জরুরি বৈঠকে বিষয়টি তোলা হয় এবং একটি ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি তাদের প্রতিবেদন ২৭ আগস্ট মেডিকেল কলেজের ডিসিপ্লিনারি কমিটিকে দাখিল করে। ডিসিপ্লিনারি কমিটি প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে। পরবর্তীতে একাডেমিক কাউন্সিলের ২২তম সভায় ওই সুপারিশ অনুমোদন করা হয় এবং অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ জাবেদ জিল্লুল বারী স্বাক্ষরিত অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে।
বহিষ্কৃতদের তালিকা ও শাস্তি
অফিস আদেশে নামভুক্ত আট শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদের একাডেমিক স্থগিতাদেশ এবং ছাত্রাবাস থেকে আজীবনের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। নিচে আদেশে প্রদত্ত তথ্য সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো:
- শরীফ উদ্দিন খান (৭ম ব্যাচ): ৭ বছর একাডেমিক কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ; ছাত্রাবাস থেকে আজীবন বহিষ্কার।
- রজব সানি (৭ম ব্যাচ): ৪ বছর একাডেমিকভাবে বহিষ্কার; ছাত্রাবাস থেকে আজীবন বহিষ্কার।
- আশীষ চন্দ্র চন্দ (৭ম ব্যাচ): ২ বছর একাডেমিকভাবে বহিষ্কার; ছাত্রাবাস থেকে আজীবন বহিষ্কার।
- আব্দুল্লাহ আবু আফফাজ (৮ম ব্যাচ): ১৮ মাস একাডেমিকভাবে বহিষ্কার; ছাত্রাবাস থেকে আজীবন বহিষ্কার।
- মো. রায়হান আলী (৮ম ব্যাচ): ১ বছর একাডেমিকভাবে বহিষ্কার; ছাত্রাবাস থেকে আজীবন বহিষ্কার।
- সাজ্জাদ ইসলাম সম্রাট (৮ম ব্যাচ): ১ বছর একাডেমিকভাবে বহিষ্কার; ছাত্রাবাস থেকে আজীবন বহিষ্কার।
- ফারদিন রহমান ইফতি (৮ম ব্যাচ): ৬ মাস একাডেমিকভাবে বহিষ্কার; ছাত্রাবাস থেকে আজীবন বহিষ্কার।
- মো. আকিব মাহমুদ: ১ বছর ছাত্রাবাস থেকে বহিষ্কার (অফিস আদেশ অনুসারে একাডেমিক মেয়াদ আলাদাভাবে উল্লেখ রয়েছে)।
| নাম | ব্যাচ | একাডেমিক শাস্তি | ছাত্রাবাস শাস্তি |
|---|---|---|---|
| শরীফ উদ্দিন খান | ৭ম | ৭ বছর | আজীবন বহিষ্কার |
| রজব সানি | ৭ম | ৪ বছর | আজীবন বহিষ্কার |
| আশীষ চন্দ্র চন্দ | ৭ম | ২ বছর | আজীবন বহিষ্কার |
| আব্দুল্লাহ আবু আফফাজ | ৮ম | ১৮ মাস | আজীবন বহিষ্কার |
| মো. রায়হান আলী | ৮ম | ১ বছর | আজীবন বহিষ্কার |
| সাজ্জাদ ইসলাম সম্রাট | ৮ম | ১ বছর | আজীবন বহিষ্কার |
| ফারদিন রহমান ইফতি | ৮ম | ৬ মাস | আজীবন বহিষ্কার |
| মো. আকিব মাহমুদ | — | (আদেশে উল্লেখ) | ১ বছর |
ইন্ধনদাতা হিসেবে সতর্ক করা শিক্ষার্থীরা
অফিস আদেশে আরও নির্দেশ আছে যে, ওই সংঘর্ষে ‘ইন্ধনদাতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা পাঁচ শিক্ষার্থীকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো অনুরূপ কার্যকলাপে জড়িত হলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। আদেশে নামপ্রকাশিত ইন্ধনদাতাদের তালিকা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হলেও সেগুলো এখানে পুনরায় সমরূপভাবে তুলে ধরা হয়নি; তবে কলেজ প্রশাসন জানিয়েছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এই সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে।
চিকিৎসা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি
ঘটনায় গুরুতরভাবে আহতদের মধ্যে একজন—তাফসির আহমেদ—এর একটি চোখ নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়। তিনি বর্তমানে ঢাকায় জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। কলেজের অফিস আদেশে আহত ছাত্রছাত্রীদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ রয়েছে।
প্রভাব, প্রশ্ন ও প্রশাসনিক বার্তা
কলেজ প্রশাসনের এই পদক্ষেপ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা রক্ষার একটি কঠোর বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এমন ঘটনা ছাত্রদের নিরাপত্তা ও মানসিক প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বর্তমানে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও সিটিইউ (চিকিৎসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ) যদি অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে, তাহলে ভবিষ্যতে অনভিপ্রেত সংঘর্ষ প্রতিরোধে কার্যকর হতে পারে—এ ধরনের সিদ্ধান্ত আদেশে প্রত্যক্ষভাবে উল্লিখিত না হলেও চিকিৎসা ও নিরাপত্তা বিষয়ক ব্যবস্থা জোরদার করার নির্দেশনা পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়িত হতে পারে।
অফিস আদেশে অধ্যক্ষ স্বাক্ষরিত এবং কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নেওয়া এই শাস্তিসহ ব্যবস্থা জেলা ও কলেজ পর্যায়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও শৃঙ্খলাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা বজায় রাখাই আপাতত প্রশাসনের মূল লক্ষ্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।