ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দত্তখোলা হাওরসহ একাধিক বিল, কৃষিজমি ও বসতভিটা মিলিয়ে মোট ১,২০০ একর ভূমি ভরাট করে প্রস্তাবিত উপশহর নির্মাণ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে বুধবার মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় সংগঠন ও বাসিন্দারা বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক কৃষক এবং এলাকার বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ বিনষ্ট হবে।
মানববন্ধন ও স্মারকলিপি
বাইপাস সড়কের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনটি আয়োজন করে 'তিতাস পূর্বাঞ্চল বসতভিটা, কৃষি জমি ও জলাশয় রক্ষা কমিটি'। কমিটির আহ্বায়ক হোসেন আহমেদ খান (বাবুর মাস্টার) সভার সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ভাসানী চর্চা কেন্দ্রের স্থানীয় সংগঠক মতিলাল বণিক, জেলা উদীচীর সভাপতি জহিরুল ইসলাম স্বপন ও কমিটির সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর হোসেনসহ অনেকে।
মানববন্ধনের পরে আন্দোলনকারীরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। স্মারকলিপিতে প্রস্তাবিত প্রকল্পের স্থান পুনর্বিবেচনা, বিল-জলাশয় ও কৃষিজমির সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশবান্ধব বিকল্প গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
আগ্রাসী বাস্তবায়ন কি করবে ক্ষত?
বক্তারা সতর্ক করে বলছেন, যদি প্রকল্পটি ঘোষিতভাবে ১২০০ একর জমি ভরাট করে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এলাকাভিত্তিক ক্ষত বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। তাঁদের আলোচনা মাত্রা ছিল—
- কৃষিজমি হারালে প্রান্তিক কৃষকদের আয়ের চাকাটি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে;
- বিল ও জলাশয় ভরাট হলে স্থানীয় জল-নির্ভরতা ও মৎস্য সম্পদ দুর্বল হবে;
- এতে এলাকার খাদ্য নিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সরকারি পদক্ষেপ ও পরিপ্রেক্ষিত
জানা গেছে, গত ১২ জুলাই গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের দপ্তর থেকে একটি নোটিশে বলা হয়েছিল যে মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও বিজয়নগর উপজেলায় সম্ভাব্য আবাসিক প্লট স্থাপন সম্পর্কিত স্থান পরিদর্শনে আসবেন। নোটিশের কপিটি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে পাঠানো হয়েছিল।
স্থানীয়রা বলছেন, পরিদর্শন ও পরিকল্পনা প্রক্রিয়া চলাকালে স্থানীয়দের মতামত অবশ্যই নেয়া উচিত ছিল। তাই তারা প্রকল্পের প্রকৃত প্রভাব যাচাই করে পরিবেশ ও সামাজিক সহনীয়তা বিবেচনায় এনে পুনর্বিবেচনার দাবি জানাচ্ছেন।
স্থানীয়দের উদ্বেগ ও ভবিষ্যৎ করণীয়
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কয়েকজন স্থানীয় কৃষক ও সমাজকর্মী জোর দিয়ে বলেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিবেশ মূল্যায়ন, সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ ও বিকল্প স্থলচিত্র উপস্থাপন করা আবশ্যক। তারা বলেন, যদি সরকার তাদের অনুরোধ অবহেলা করে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করে, তখন কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
| প্রস্তাবিত ভূমি | প্রভাবিত এলাকা |
|---|---|
| ১,২০০ একর (বাজার ভিত্তিক) | দত্তখোলা হাওর, বিভিন্ন বিল, কৃষিজমি ও বসতভিটার অংশ |
স্থানীয় উপজেলা ও জনজীবন
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিজয়নগর ও সদর উপজেলার বহু পরিবার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হবে—কৃষিজমি কমে যাওয়ায় আয়ের উৎস সংকুচিত হবে, মৎস ও জলজসম্পদ না থাকলে ক্রমশ আয় কমে যাবে এবং স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানুষের উদ্বেগের কেন্দ্রে এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যা শুধুমাত্র ভৌগোলিক বদলে গেলেই সমাধান হয়ে যাবে না।
বর্তমানে আন্দোলনকারীরা স্থানীয় প্রশাসন ও সর্বোচ্চ রাজস্ব কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের দাবি তুলে ধরেছে। তারা বলছে, প্রকল্প বাতিল না হলে ও স্থানীয় মতামত অনুসারে না বদলালে তিনি আরও সংগঠিত আন্দোলন চালাবেন।
এপ্রকাশ্যে প্রশাসনিক পর্যায় থেকে কী প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কি ব্যাখ্যা করবে—এ সবই ভবিষ্যতে জানা যাবে। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নজরে রাখছে স্থানীয় কমিটি ও বিভিন্ন সুশীল সম্প্রদায়।
হাবিবুর রহমান
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি, WE NEWS