ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নেই, তদন্তে বড় ফাঁক
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ঘটানো চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে অন্যতম প্রধান প্রমাণ হওয়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন মিলছে না তদন্ত কর্মকর্তার কাছে। মৃত ইসমাইল মিয়ার পরিবারের অভিযোগ ও পুলিশের নথি থেকে জানা যায়, সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে—কিন্তু আট মাস পেরিয়ে গেলেও তা তদন্ত শাখার হাতে পৌঁছেনি।
- নিখোঁজ ও হত্যাকাণ্ড: শরীফপুর ইউনিয়নের লামা শরীফপুর গ্রামের মৃত উজির আলীর ছেলে ইসমাইল মিয়া (৬২) গত বছরের ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন।
- জিডি ও তদন্ত:翌 ২৪ জানুয়ারি ইসমাইলের ছেলে সাদ্দাম আশুগঞ্জ থানা-এ জিডি করেন। তদন্তে বেরিয়ে আসে হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য; পরে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
- আসামি: মামলায় এজাহারভুক্ত শান্তা বেগম (৩২) ও তার স্বামী সুমন (৩৭)।
পুলিশি নথি ও পরিবারের দাবি
পুলিশি সূত্রে জানা যায়, নিহতের মোবাইলে নিছক কথোপকথন থেকে তদন্ত শুরু হয়ে সন্দেহভাজনদের হেফাজতে নেয়া হয়; দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে পুলিশের দাবি অনুযায়ী হত্যাকাণ্ড স্বীকার করা হয়। তফসিল অনুযায়ী, হত্যার কারণ হিসেবে জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও ধার চাওয়া-অস্বীকৃতির কারণে সংঘাতের পর ধারালো অস্ত্র দ্বারা ইসমাইলকে হত্যা করা হয় এবং মরদেহ সেপটিক ট্যাংকে ফেলে রাখা হয়। পুলিশ ওই স্থান থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর নিহতের ছেলে মরদেহ শনাক্ত করেন।
তবে মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ এই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে তীব্র বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। নথিতে আছে, গত বছরের ১৬ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জনের স্বাক্ষরিত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পাঠানো হয় এবং ২১ এপ্রিল সেটি পুলিশ সুপারের কার্যালয় গ্রহণও করেছে। তবু আশুগঞ্জ থানার তদন্ত শাখা জানায় তারা ওই প্রতিবেদনটি পাননি।
“গায়েব!”
নিহত পরিবারের অভিযোগ, তদন্তে গাফিলতির ফলে মামলাটি অকারণে দীর্ঘায়িত হচ্ছে। হামলার ঘটনাটি ঘটার পর ২০ মাস পেরিয়ে গেলেও আদালতে চার্জশিট দাখিল হয়নি—এটি তারা বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়া হিসেবে দেখেন। তাদের বক্তব্য, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রমাণাদি না থাকলে মামলার সুষ্ঠু নিষ্পত্তি হওয়া সম্ভব নয়।
স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের অবস্থান
পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণের তথ্য থাকলেও তা কিভাবে ও কেন থানার তদন্ত শাখার কাছে পৌঁছায়নি—এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ওই সূত্রে পাওয়া যায়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবেদন যদি এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে পাঠানো হলেও যোগাযোগের ত্রুটি, দস্তাবেজের ভুল হস্তান্তর বা অভ্যন্তরীণ রেকর্ডিং সমস্যা থাকতে পারে।
নথি অনুযায়ী, মামলার দুই এজাহারভুক্ত আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে উল্লেখ রয়েছে; তবু চার্জশিট না হওয়ায় আদালতে তা যাচাই-বাছাই ও বিচারের পথে এগোতে পারছে না।
| ঘটনা | তারিখ/বিবরণ |
|---|---|
| ইসমাইল নিখোঁজ | গত বছর ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যার পর |
| জিডি | ২৪ জানুয়ারি, মৃতের ছেলে সাদ্দামের দেওয়া |
| ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন স্বাক্ষর | গত বছরের ১৬ এপ্রিল (সিভিল সার্জনের স্বাক্ষরিত) |
| পুলিশ সুপারের অফিসে গ্রহণ | ২১ এপ্রিল (নথি অনুযায়ী) |
| আদালতে চার্জশিট | এখনো দাখিল হয়নি (প্রায় ২০ মাস কেটে গেছে) |
স্থানীয় আইনজীবী ও সাধারণ মানুষ বলছেন, তদন্তের এই ধরনের অনিয়ম যদি সত্যি থাকে তাহলে তা আইনি প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুন্ন করবে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হল হত্যাকাণ্ডের কারণ-নির্দেশক ও সময়, আঘাতপ্রাপ্ত স্থানের বিবরণ—এসব তথ্য ছাড়া তদন্তকারীর কাছে কার্যকর অভিযোগ দায়ের ও তদনুযায়ী চার্জশিট প্রস্তুত করা কঠিন।
নিহত পরিবারের সদস্যরা দ্রুত এবং স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করেছেন। পাশাপাশি তারা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত তদন্ত শাখার হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয়ভাবে এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হলে সামাজিক উত্তেজনার সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও ব্যক্ত করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রাসঙ্গিক দফতর থেকে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না এলেও স্থানীয়দের উদ্বেগ কমাতে দ্রুত তদন্ত ও প্রতিবেদন হস্তান্তরের দাবি উঠেছে।