১৯৯৪ সালে ঢাকার পথে বেরিয়ে আর বাড়ি ফেরেননি বরগুনার এক কিশোরী। দীর্ঘ তিন দশক পার হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও পরিবার জানত না তিনি জীবিত আছেন কি না, কোথায় আছেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহায়তায় পাকিস্তানে থাকা হিসেবে শনাক্ত হলেন ওই মেয়ে—নাম আছিয়া। এখন তিনি দেশে ফিরতে চান এবং তার ৯০ বছর বয়সী বাবা তমিজ উদ্দিন মরার আগে কন্যাকে ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।
ঘটনার পটভূমি
প্যারিবারিক সূত্র জানায়—নব্বই দশকের শুরুতে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় চলে যায় আছিয়ার পরিবার। মিরপুরের বড়বাগে ভাড়া বাসায় ছিলেন তারা; তমিজ উদ্দিন দিনমজুরি করতেন। ১৯৯৪ সালের এক বিকেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ১৬ বছর বয়সী আছিয়া আর ফিরেননি। ব্যাপক খোঁজাখুঁজি করেও কোনো সন্ধান পাননি আত্মীয়রীরা; শেষপর্যন্ত গ্রামে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয় পরিবারের সদস্যরা।
স্মৃতির ফাঁকে হারিয়ে যাওয়া সময়
আছিয়ার নিখোঁজের পরে পরিবারের জীবন চলছিল—পাঁচ বোনের বিয়ে, ভাইয়ের সংসার গঠন। তিন বছর আগে মারা যান আছিয়ার মা রাহেলা। কালের গতি, স্মৃতির বিলীনতায়ও পেছনের দেয়ালে লেগে ছিল খোঁজ পাওয়ার আকুতি।
কিভাবে মিলল সন্ধান
কের্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই পরিবারের কাছে আশা হয়ে এসেছিল। আছিয়ার মেয়ে কয়েক দিন আগে নিজের পরিচয় ও বাংলাদেশের পিতার ঠিকানা জানিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেই পোস্ট দেখে বাংলাদেশের ওই এলাকার একজন ঠিকানা যাচাই করে আছিয়াকে চিনতে সক্ষম হন। ঠিকানা মিললেই পরিবারের কাছে আছিয়ার ছবি পাঠানো হয়। ছবি দেখে আত্মীয়রা নিশ্চিত হন—হ্যাঁ, তিন দশক আগে হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তি তিনি নিজেই।
"মরার আগে আমার আছিয়ারে একবার দেখতে চাই। আমার ৯০ বছর বয়সে মাইয়ারে না পাইয়া শোকে কাতর হইয়া ছিলাম। এখন আল্লাহ আমার মায়ের খোঁজ দিয়েছে। আমি চাই মরার আগে ওরে একটু ছুইয়া দেখতে।"
এই আহ্বান করেছেন তমিজ উদ্দিন, যিনি বর্তমানে বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের চারাভাঙ্গা গ্রামে বাস করেন। গ্রামে তার জীর্ণ ছোট ঘরটিতে বসে দিন কেটে যায়—প্রতিবেশী রিয়াজ যখন মোবাইল দিয়ে আছিয়ার মুখ দেখান, তখন তার অভিব্যক্তি পরিবর্তিত হয়; হাসি-নিঃশ্বাস-বিরসেরা সময় আসে মিশ্রিত রেশে।
পরিবারের প্রত্যাশা এবং প্রশাসনিক সহযোগিতা
আছিয়া এবং তার পরিবার চান বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরকার এবারের ঘটনায় সহযোগিতা করবে যাতে তিনি দ্রুত দেশে ফিরতে পারেন। পরিবারের দাবি-অনুরোধ মূলত কাগজপত্র, ভ্রমণ অনুমতি ও নিরাপদ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে। আনুষ্ঠানিক বা কুটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ইতোমধ্যে কোন নির্দেশনা বা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—এটা সংবাদ উপকরণে উল্লেখ নেই।
স্থানীয় প্রেক্ষাপট ও প্রভাব
একজন দীর্ঘদিন নিখোঁজের সন্ধান পাওয়া শুধু একটি পারিবারিক মিলনের ঘটনা নয়; এটা স্থানীয় সমাজে বৃষ্টি-বিধ্বস্ত স্মৃতিকে আবার জীবন্ত করে তোলে। বার্ধক্যগ্রস্ত পিতার মানসিক প্রশান্তি, আত্মীয়-নাতি-নাতনিদের কৌতূহল-উৎসুকতা—সব কয়েক মাসের ভেতর নতুন করে জীবনকে ছেঁকে দিতে পারে। একই সঙ্গেRaises প্রশ্ন—ত্রিশ বছরেরও বেশি সময়ে নারীদের পাচার, দমন ও আন্তর্জাতিক সীমানা পার হয়ে মানবিক নিরাপত্তা নিয়ে সরকারি ও সামাজিক মানচিত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বা নেওয়া উচিত।
- আবেদন: আছিয়া ও তার পরিবার বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরকারের সাহায্য চান।
- পরিবারের অবস্থা: বাবা তমিজ উদ্দিন, ৯০ বছর; মা রাহেলা মৃত্যুবরণ করেছেন; আছিয়ার ছয় বোন-ভাইদের মধ্যে কয়েকজন সংসার করেছেন।
- সম্প্রতি খোঁজ মিলার মাধ্যম: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (ফেসবুক)।
পরবর্তী অপেক্ষা
এখন প্রশ্ন হলো—কত দ্রুত কাগজপত্র ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আছিয়াকে দেশে আনা যাবে। পরিবারের আবেগমূলক অনুরোধ অনুযায়ী, বাবার মৃত্যুর আগেই মেয়েকে দেখা তার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা। স্থানীয়রা বলছেন, এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তা আবারও স্পষ্ট হলো।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নিখোঁজের সময় | ১৯৯৪ (প্রায়) |
| নিখোঁজ বয়স | ১৬ বছর |
| বর্তমান অবস্থান (পরিবার তথ্য অনুযায়ী) | পাকিস্তান |
| পরিবারের প্রধান দাবী | বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরকারের সহযোগিতা করে দেশে ফিরিয়ে আনা |
স্থানীয় প্রশাসন কিংবা দূতাবাস-কূটনৈতিক কোনো সংস্থার আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ ও সময়সীমা সম্পর্কে খবরের তরফে তখনই বিস্তারিত জানানো যাবে, যখন পরিবারের পক্ষ থেকে বা সরকারি পর্যায় থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণা আসবে। আপাতত চারাভাঙ্গার ছোট বাড়িতে বাবার প্রতিদিনের আকুতি, কাগজপত্রের অদৃশ্য পথে অপেক্ষা, আর সামাজিক মাধ্যমের মধ্য দিয়ে ফিরে আসা এক অতীত—এই তিনটি লাইনেই এখনও পড়ে আছে আছিয়ার গল্প।