বয়স তখন মাত্র ১৬ বছর। জীবিকার তাগিদে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় এসে মিরপুরের বড়বাগ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন আছিয়া। ১৯৯৪ সালের এক দিন বাড়ি ফিরতে রওয়া হওয়ার কথা বলে সে বের হয়ে যায়—পরে আর বাড়ি ফেরেনি। শুক্রবার পর্যন্ত কেটে গেছে গত কয়েক দশক, আর আজ সেই নিখোঁজ মেয়েকে খুঁজে পেয়েছে পরিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যামে প্রচেষ্টার মাধ্যমে।
ফেসবুক জড়িয়েই মিলল খোঁজ
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৪ সালে ঢাকা থেকে পাকিস্তানে পাচার হওয়ার পরে আছিয়ার সঙ্গে পরিবারের কাউকে যোগাযোগ ছিল না। কয়েক বছর ধরে মেয়ের খোঁজে তৎপরতা না থাকলেও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা একটি পোস্ট থেকেই শুরু হয় নতুন চেনাশোনা। আছিয়ার মেয়ের একটি পোস্টে তার পরিচয়-ঠিকানা উল্লেখ থাকায় একটি দুর্ঘটনাহীনভাবে খোঁজ মিলেছে।
স্থানীয়রা বলছেন, পোস্ট দেখার পর গ্রামের কয়েকজন মুরব্বি ও প্রতিবেশী এগিয়ে গিয়ে তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত হন। এরপর যোগাযোগের চেষ্টা সার্থক হয়—বাবা তমিজ উদ্দিন, ভাই এবং আত্মীয়দের ছবির মাধ্যমে পরিচয় মেলে।
"ফেসবুকে আমাদের গ্রামের এক নারীর হারিয়ে যাওয়ার বিজ্ঞপ্তি দেখতে পাই। পরে মুরব্বিদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হই,"
এই কথা বলেছেন আছিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে ভূমিকা রাখা রিয়াজ উদ্দিন। সূত্রের বরাত দেয়া হয়েছে যে, ছবি ও পরিচয়ের মিল দেখে আছিয়া ফোনে পরিবারের সদস্যদের চিনতে পেরেছেন এবং নিয়মিত কথাও হচ্ছে। কিন্তু ৩২ বছরের শূন্যতা ছেঁড়া গেলেও দেখা-আড্ডা বা স্পর্শের সুযোগ নেই—কারণ আছিয়া পাকিস্তানে থাকেন এবং দেশে ফিরতে সরকারি সহযোগিতা চান তিনি ও তার পরিবার।
বাবার অপেক্ষা, মনের কষ্ট
বরগুনার সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের চারাভাঙ্গা গ্রামে ওই পরিবার বাস করে। সেখানে ৯০ বছরের বৃদ্ধ বাবা তমিজ উদ্দিন হাওলাদার বিশেষভাবে দুর্বল শরীরেই অপেক্ষা করছেন। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, মোবাইলের পর্দায় মেয়ের ছবি ও কণ্ঠ শুনলে তার অভিব্যক্তি বদলে যায়—আবার হাসেন, আবার চোখে জল জড়ায়।
আছিয়ার মা কয়েক বছর আগে মেয়ের অপেক্ষায় মারা গেছেন। এখন পরিবারের তরফে তারা চান আছিয়া যেন দেশে ফিরিয়ে আনা হয়, যাতে বৃদ্ধ পিতাকে জীবিত অবস্থায় মেয়েকে দেখার সুযোগ মেলে। এই প্রত্যাশা পূরণে তারা বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয় সরকারের কাছে সহযোগিতা প্রার্থনা করেছেন।
অভিবাসন-নিরাপত্তা ও প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গ
ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে একটি বড় বার্তা দিল যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—বিশেষত ফেসবুক—কিভাবে দীর্ঘদিন গৌমানের মধ্যে থাকা পরিবারের সজাগতা তৈরি করে কাউকে খুঁজে পেতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক সহায়তা ও কাগজপত্রবিহীন স্থানান্তরের জটিলতা, সাহায্য প্রদানের প্রক্রিয়া ও প্রত্যাবর্তন সংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রশ্নও উপস্থাপন করে।
পরিবার বলেছে, আছিয়া ও তাদের প্রতিনিধি উভয়ে চান বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরকার যেন আনুষ্ঠানিকভাবে সহযোগিতা করে—যাতে কাগজপত্র, ভ্রমণ ও আইনগত দিক ঠিক করে আছিয়া নিরাপদে দেশে ফিরতে পারেন।
ঘটনাপ্রবাহ সংক্ষেপে
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| নিখোঁজের সময় | প্রায় ১৯৯৪ সাল (প্রথম ঢাকা থেকে অদৃশ্য) |
| সন্ধানের মাধ্যম | সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (ফেসবুক) ও স্থানীয় তদারকি |
| বর্তমান অবস্থান | পাকিস্তানে অবস্থানরত — পরিবার পরিচিতি পেয়েছে |
| পরিবারের দাবি | বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরকারের মাধ্যমে নিরাপদ প্রত্যাবর্তন |
স্থানীয় আবেদন ও পরবর্তী করণীয়
- পরিবার দ্রুত কাগজপত্র ও যোগাযোগের দিকটি নির্ধারণে তৎপর।
- আছিয়া ও তার পরিবারের অনুরোধ—সরকারি পর্যায়ে সহায়তা চান তারা।
- স্থানীয় সমাজ ও মুরবিরা যোগাযোগে ভূমিকা রেখেছেন এবং প্রয়োজনে আরও প্রশাসনিক সহায়তা আহ্বান করা হবে।
বর্তমানে পরিবারের এবং আছিয়ার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক নথিপত্র, আইনী প্রক্রিয়া বা কূটনৈতিক লিংকের আবেদন কোথায় জমা দেওয়া হয়েছে—এমন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিবরণ এখনও প্রকাশ করা হয়নি। আন্তর্জাতিকভাবে এমন কেসে কাগজপত্র যাচাই, কনস্যুলার ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ পরিবহনের জন্য সময় ও সহযোগিতা প্রয়োজন। স্থানীয়রা আশা করছেন সরকারি সাহায্য পেলে তাড়াতাড়ি আছিয়া দেশে ফিরে আসবেন এবং দীর্ঘদিনের কষ্টের অবসান হবে।
এই ঘটনায় বাড়তি নজর দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নেতারা এবং সামাজিক কর্মীরা—বিশেষত শিশু ও কিশোরী পাচার প্রতিরোধ, পারিবারিক সচেতনতা ও সামাজিক নিরাপত্তার দিকে লক্ষ্য রেখে।