ঝালকাঠির শহর অংশের সুগন্ধা নদীতে মঙ্গলবার বিকেলে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা গেছে। জেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ/মৎস্য অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতা লঞ্চঘাট থেকে শুরু হয়ে মিনিপার্ক সংলগ্ন এলাকায় শেষ হয়।
অংশগ্রহণ ও দর্শকরা
প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী নৌকা ও দলসংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অল্পতম ভিন্নতা দেখা গেছে—কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মোট ৯টি দল যোগ দিয়েছে, আবার অন্যান্য সংবাদে তা ১০টি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একমত যে বিষয়টি হলো—নৌকাবাইচ দেখতে নদীর দুই তীরে সর্বস্তরের মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল। ঢাক-ঢোলের তালে-তালে এবং প্রচণ্ড উল্লাসে পুরুষ, মহিলা ও শিশু সকলে মিলে বাইচটি উপভোগ করেন।
নৌকাবাইচ চলাকালীন সময়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌপুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের পৃথক দল নদীপথে দায়িত্ব পালন করে। স্থানীয়রা বলছেন, নিরাপত্তার এই উপস্থিতি দর্শক ও প্রতিযোগীদের জন্য আশ্বস্তকরণ ছিল।
বৈঠা-নৈপুণ্য ও উৎসবমুখর পরিবেশ
বৈঠার ছন্দে এবং দলের নেতৃত্বে হাঁকডাকের সুরে সুগন্ধা নদীর জলে নৌকার দ্রুততা ও গ্রাস লক্ষণীয় ছিল। তরুণ ও প্রবীণ জেলেরা তাদের ঐতিহ্যগত কৌশল, শক্তি ও সমন্বয় দেখিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। নদীর দুই তীরে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকরা করতালি, উল্লাস ও উপস্থিত বক্তৃতার মাধ্যমে দলের মানসিক অবস্থা উজ্জীবিত করেন—যা পুরো আয়োজনে মানুষকেন্দ্রিকতা এবং সাংস্কৃতিক স্পন্দন জাগিয়ে তোলে।
অনুষ্ঠানের পরে মিনিপার্ক সংলগ্ন স্থানে বিজয়ীদের জন্য পুরস্কার বিতরণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়, যেখানে জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন সভাপতিত্ব করেন।
সমাপনী ও উচ্চ পর্যায়ের উপস্থিতি
সমাপনী অনুষ্ঠানে মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগের উপপরিচালক মো. মুসফিকুর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমান উল্লাহ সরকার এবং জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. এনামুল হকসহ জেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের অন্যান্য কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে ছিলেন এবং বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
বিজয়ী ও প্রতিযোগিতার ফল
সংগ্রৃহীত তথ্য অনুযায়ী প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে ধানসিঁড়ি গ্রুপ, দ্বিতীয় স্থানে গাবখান গ্রুপ এবং তৃতীয় স্থানে জাঙ্গালিয়া গ্রুপ। স্থানভিত্তিক তথ্য নিম্নে তালিকাভুক্ত করা হলো:
- প্রথম স্থান: ধানসিঁড়ি গ্রুপ (নেতা: মাহবুব সিকদার)
- দ্বিতীয় স্থান: গাবখান গ্রুপ (নেতা: চান মিয়া হাওলাদার)
- তৃতীয় স্থান: জাঙ্গালিয়া গ্রুপ (নেতা: সোবাহান হাওলাদার)
| পদ | গ্রুপ | নেতার নাম |
|---|---|---|
| প্রথম | ধানসিঁড়ি | মাহবুব সিকদার |
| দ্বিতীয় | গাবখান | চান মিয়া হাওলাদার |
| তৃতীয় | জাঙ্গালিয়া | সোবাহান হাওলাদার |
স্থানীয় মূল্যায়ন ও প্রাসঙ্গিকতা
উপসভার বক্তারা নৌকাবাইচকে বাঙালির নদী-খাল ও নৌকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জীবনধারার অংশ হিসেবে উদ্দীপ্ত করেছেন। তারা বলেছেন, ঐতিহ্যকে ধরে রাখা ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ অভিযানের সঙ্গে স্থানীয় সাংস্কৃতিক কার্যক্রমগুলোকে মিলিয়ে নিতে হবে যাতে সমগ্র কমিউনিটি উপকৃত হয়। আয়োজক কর্তৃপক্ষও বলেন, জাতীয় মৎস্য পক্ষকে জনগণ ভিডিও করে, অংশগ্রহণ করে এবং সরাসরি উপলব্ধি করে—যা কর্মসূচির সার্থকতা প্রমাণ করে।
স্থানীয়দের অনেকে আশা প্রকাশ করেছেন যে ভবিষ্যতে নৌকাবাইচের মতো সংস্কৃতি-শিল্পকর্মগুলোতে আরো বেশি তরুণ-তরুণীকে যুক্ত করে নদীজীবন ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হবে।
অনুষ্ঠানটি জেলাভিত্তিক ঐতিহ্য রক্ষায় একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নৌকাবাইচ শেষে পুরস্কারপ্রাপ্তরা শহরের মানুষের আলিঙ্গন ও সমাদর নিশ্চিত করেছেন—এবং সুগন্ধা নদীর সার্বজনীনত্ব ও সামাজিক বন্ধনকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা পেল।