পিরোজপুর পৌরসভার ভাইজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে শুক্রবার বিকেলে আয়োজিত সচেতনতামূলক সভায় জেলা ও পৌর পর্যায়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা মিলিত হয়ে এলাকার মাদক, সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও চুরি নির্মূলের ওপর আলোচনা করেছেন। সভায় প্রধান আপাত বক্তা ছিলেন সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম, যিনি মাদক ব্যবসায় ও দূরাচারের বিরুদ্ধে নিজের অটল অবস্থান ব্যক্ত করেন।
ওসির স্পষ্ট বিবৃতি
ওসি মো. শরিফুল ইসলাম সভায় একটি দৃঢ় বক্তব্য দেন। তিনি বলেন—
“একজন মাদক কারবারি ইয়াবা বিক্রি করে আমাকে ১০০ কোটি টাকা দিলেও আমি নেব না।”
এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতি ও অবৈধ লেনদেন প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং স্থানীয় মানুষের কাছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি আরও বলেন যে, সমাজ উন্নত করতে বাহ্যিক কারো ওপর নির্ভর করা যাবে না, পরিবর্তন শুরু করতে হবে পরিবারের ও সমাজের নিজস্ব দায়িত্ববোধ থেকে।
সমাজ ও পরিবার—সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু
সভায় বক্তারা মিলিতভাবে বললেন যে শুধুমাত্র পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করে সমস্যা মেটবে না। তাদের বক্তব্য ছিল—
- পরিবারকে কিশোরদের প্রতি আরও সক্রিয় ও সতর্ক হতে হবে।
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে পারস্পরিক সমন্বয়ে কাজ করতে হবে।
- স্থানীয় নেতারা ও নাগরিকরা বাধ্যতামূলকভাবে অংশগ্রহণ করবেন—বহিরাগততার প্রত্যাশা রেখে বসে থাকা চলবে না।
ওসি শরিফুলের একেবারে সরল কিন্তু জোরালো বক্তব্য—"আপনার ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যৎ আপনাকেই গড়তে হবে"—এই বার্তাকে সভার বক্তারা গুরুতর নেওয়ার অনুরোধ করেন।
সভা ও অংশগ্রহণকারীরা
সভাটি পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আহসান কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এস এম সাইদুল ইসলাম কিসমত। বিশেষ অতিথি হিসেবে সাথে ছিলেন সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী, ভয়েস অব এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ার্ড পারসন (VOED)-এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম মিঠু। এছাড়া ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির নেতা ও স্থানীয় আরও কয়েকজন ব্যক্তি বক্তব্য দেন।
কীভাবে এগোতে হবে—প্রস্তাবিত দিকনির্দেশনা
সভায় আলোচিত কিছু বাস্তবধর্মী উপায় তুলে ধরা হলো—
- স্বাস্থ্যবিধি নয়, এখানে সামাজিক সতর্কতা: পরিবারের অভিভাবকদের কিশোরদের দৈনন্দিন কার্যকলাপ নজরদারি করা।
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ক জোরদার করে আত্মবিশ্বাস ও নৈতিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া।
- স্থানীয় নেতারা এবং নাগরিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে অপরাধ প্রবণতাসম্পন্ন তরুণদের সদগুণে ফেরানোর উদ্যোগ নেয়া।
| সমস্যা | দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্ষেত্র |
|---|---|
| মাদকবিক্রি ও সেবন | আইনশৃঙ্খলা, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান |
| কিশোর গ্যাং | সমাজ, নন-ফরমাল শিক্ষা, যুব সংগঠন |
| চাঁদাবাজি ও চুরি | স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক পর্যবেক্ষণ |
স্থানীয়দের আবেদন ও বাস্তবকের আহ্বান
সভায় অংশগ্রহণকারীরা এলাকার শান্তি ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তাদের বক্তব্য—যেসব লোক মাদকের সঙ্গে জড়িত তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়; তারা সংশোধনের সুযোগ আছে। তবে সংশোধন-প্রক্রিয়ায় স্থানীয়দেরই সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে এবং যারা দায়িত্ব নিতে চায় তাদেরকে নিরাপত্তার বিষয়েও ব্যবস্থা করতে হবে।
সভা পরিচালনা করেন মো. কুদরত শেখ। আয়োজকরা জানান যে এই ধরনের সচেতনতামূলক সভা চলমান থাকবে এবং তারা আশা করেন স্থানীয় জনগণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন মিলিয়ে অপরাধমুক্ত ও নিরাপদ সমাজের লক্ষ্যে কাজ করবে।
এই আলোচনায় উত্থাপিত বার্তা স্পষ্ট—নাগরিক পরিষ্কারভাবে জানতে চাইছে যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একা সবকিছু ঠিক করে দিতে পারবে না; পরিবার ও সমাজের প্রতিটি স্তরই যদি দায়িত্ব নেয়, তবেই মাদক ও অন্যান্য সামাজিক অপরাধ কমবে। ওপরে উল্লিখিত ওসির প্রতিজ্ঞা—"১০০ কোটি দিলেও নেবো না"—স্থানীয় মানুষের কাছে প্রতিশ্রুতি ও নৈতিকতার একটি প্রতীক হিসেবে গ্রহন করা হচ্ছে।