ভবন নির্মাণ আটকে, পাঠের পরিবেশ নষ্ট
পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার আংগারিয়া ইউনিয়নের জলিশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়-এর চারতলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি ছয় বছর পেরিয়ে আজও অসম্পন্ন থেকে গেছে। সরকারি বরাদ্দ ও ঠিকাদারি কাজে দীর্ঘকালীন স্থবিরতা শিক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলেছে—এমনটি বিদ্যালয় ও এলাকায় পড়া-শোনা করে জানা গেছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ৮০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের অধীনে ২০২০ সালের ৩ মার্চ মেসার্স হাসান অ্যান্ড ব্রাদার্স নামে পটুয়াখালীর একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে কাজটি দেওয়া হয়। তবে কাজ শুরু হওয়ার পর কয়েক মাসের মাথায় নির্মাণ কার্যক্রম থমকে যায়; মাত্র ৫-৬ ফুট উচ্চতার কলম নির্মাণ করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ করে দেয় এবং এরপর থেকে তাদের কোনো প্রতিনিধির খোঁজ মেলেনি।
দৈনন্দিন ক্লাসে কক্ষ সংকট ও তালাবদ্ধ শ্রেণিকক্ষ
নির্মাণ বন্ধ থাকায় বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গাদাগাদি করে বসতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক সময় অনুশাসনভঙ্গ ও পাঠদানে বিঘ্ন ঘটছে; ফলে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কম সময় ক্লাস নেওয়া হচ্ছে এবং সিলেবাস পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। শিক্ষকরা পালাক্রমে বা ‘শিফটিং’ পদ্ধতিতে ক্লাস চালাচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে অভিভাবকরা ভয় পাচ্ছেন।
স্কুল কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারকে বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষ ব্যবহার করার জন্য দেয়ার পরও সেটি আজ অনেকদিন ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। তালা ঝুলানো সেই কক্ষ ব্যবহারে অনুপযুক্ত; ফলে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার আয়োজন ও সহশিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ
প্রধান শিক্ষক গৌতম হাওলাদারের মন্তব্য থেকে স্পষ্ট—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যত অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে।
“নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার সময় আমরা খুবই আশান্বিত ছিলাম। কিন্তু ছয় বছরের বেশি সময় পার হলো, ভবন আর তৈরি হলো না। একদিকে কক্ষ সংকট, অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের টালবাহানা।”
তিনি ও বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক অভিভাবকদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও সরাসরি কোন সমাধান মেলেনি। স্থানীয়রা আশা করেন সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ করে কাজ পুনরায় শুরু করাবেন।
প্রকল্পের সামগ্রিক তথ্য
প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত বাস্তব অবস্থা নিম্নে টেবিলে তুলে ধরা হল—
| বিষয় | বিস্তারিত |
|---|---|
| প্রকল্পের নাম | চারতলা একাডেমিক ভবন, জলিশা মাধ্যমিক বিদ্যালয় |
| অর্থায়ন | সরকারি বরাদ্দ, মোট: ৳৮০,৭৫,০০০ |
| কার্যাদেশ/শুরু | ২০২০-০৩-০৩ (শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর থেকে) |
| ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান | মেসার্স হাসান অ্যান্ড ব্রাদার্স (পটুয়াখালীর ঠিকাদারি) |
| বর্তমান অবস্থা | কাজ অর্ধেক নয়; প্রাথমিক স্তরে কলম নির্মাণ করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে স্থবির |
স্থানীয় প্রশাসন এবং পরবর্তী করণীয়
এমন দীর্ঘ স্থবিরতার পর প্রশ্ন ওঠে—কর্তৃপক্ষ কেন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর এবং জেলা তথা উপজেলা প্রশাসনের তদারকি নিয়ে স্থানীয় জনস্বার্থে দ্রুত উত্তরদায়িত্ব নেওয়া প্রয়োজন। কার্যাদেশ দেওয়ার পর ঠিকাদার কর্তৃক দায়িত্বে অবহেলা বা অন্যান্য কোনো কারণ থাকলে তা জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করা উচিত এবং প্রয়োজন হলে পুনরায় ঠিকাদারি বাছাই বা প্রকল্পটি জনগণের স্বার্থে সম্পন্ন করানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
- শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও পাঠদানের মান দ্রুত খতিয়ে দেখা দরকার।
- ঠিকাদার সংস্থার বিরুদ্ধে দায়িত্বহীনতার কারণ খতিয়ে দেখাতে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক তদন্ত জরুরি।
- অস্থায়ী ব্যবস্থায় কীভাবে শ্রেণিকক্ষ সংকট মোকাবিলা করা হবে তা ঠিক করে কার্যকরী পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
জলিশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত এই অনিশ্চয়তা যদি দ্রুত সমাধান না হয়, তা হলে কেবলই শিক্ষাক্ষেত্রে নয়, স্কুল-সমাজের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় সমাজকর্মীরা। স্থানীয়দের দাবি, পটুয়াখালী জেলার প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগ দ্রুত তদন্ত করে দাবি পূরণে এগোবে—এরই অপেক্ষায় এলাকাবাসী ও বিদ্যালয় পরিবার।
পত্রদূত: সঞ্জয় মজুমদার, পটুয়াখালী প্রতিনিধি, WE NEWS