পটুয়াখালীর সদর ও দুমকী উপজেলার ন’টি গ্রামে দীর্ঘ এক দশক দেড়েক ধরে বদরোগের মতো বিরক্তিকর পচা পানির দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা আর শুকনো মৌসুমে বেঁধে থাকা খালের পচা পানি—এই দুই পরিস্থিতিই তাদের জীবনযাত্রা প্রভাবিত করছে। প্রভাবিত এলাকার মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার, অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু মৌকরণ খাল।
সমস্যার কারণ ও স্থানীয় পরিস্থিতি
স্থানীয়দের অভিযোগ এবং পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র মিলিয়ে দেখা গেছে সমস্যার মূলনীতি—খালটির গভীরতা স্বল্প হয়ে যাওয়ায় পানির ধারণক্ষমতা কমে গেছে এবং পানির সরবরাহ-নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত। পাউবো সূত্রে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালে খাল খনন ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নকালে ১ হাজার ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০০ ফুট প্রস্থের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল; কিন্তু বাস্তবে খালটি খনন করা হয়েছে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ ফুট প্রশস্ততায়।
খালের মাঝামাঝি স্থানে একটি তুলনামূলক ছোট বক্স কলভার্ট এবং খালটির শেষাংশে একটি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে। এই নির্মাণ ও খনন পদ্ধতি পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে, ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা বাড়ছে এবং শুকনো মৌসুমে বেঁধে থাকা পানিতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়ায়।
প্রভাবিত গ্রাম ও জনজীবন
খালটির এক দিকে রয়েছে মৌকরণ গ্রাম এবং অপর পাশে লেবুখালী; এছাড়া খালের সংবলিত অন্য সাতটি গ্রামের মানুষও সমস্যায় পড়েছেন। প্রভাবিত এলাকার তালিকা—মৌকরণ, শ্রীরামপুর (সদর), লেবুখালী, কার্তিপাশা, পূর্বকার্তিকপাশা, আঠারগাছিয়া, শ্রীরামপুর (দুই উপজেলা), কালিকাপুর ও জামলা।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| প্রভাবিত গ্রাম | মৌকরণ, শ্রীরামপুর, লেবুখালী, কার্তিপাশা, পূর্বকার্তিকপাশা, আঠারগাছিয়া, কালিকাপুর, জামলা |
| আনুমানিক জনসংখ্যা | ~৭৫,০০০ |
| প্রকল্প শুরু | ২০০৮ |
স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা ও দাবি
লোকালয়বাসী জানান, দীর্ঘদিন ধরে জলে ঘটে যাওয়া পচন-জন্য দুর্গন্ধ ও জলাবদ্ধতার কারণে নালা-নর্দমা ও খালে আবর্জনা জমে গেছে। গবাদি পশু ও পাখির স্বাস্থ্য-ঝুঁকি ও গনজীবনেও প্রভাব পড়ছে বলে তারা বলছেন। একজন স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাগর আকন বলেন—
“বদ্ধ খালের পচা পানি আমাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।”
অপর একটি অভিযোগ পাউবো কাজের পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে বিকল্প খাল ও স্লুইসগেট করা—ফলে পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়ে। মৌকরণ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন—
“পাউবো বাঁধ নির্মাণের সময় পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে পানিনিষ্কাশনের জন্য বিকল্প খাল ও স্লুইসগেট নির্মাণ করেছিল।”
সমাধান ও দরকারি পদক্ষেপ
স্থানীয়রা বলেন, খালটি প্রকল্প অনুযায়ী পুনঃখনন, এবং মাঝখানের বক্স কলভার্টটি পূর্ণাঙ্গভাবে নির্মাণ করলে সমস্যা অনেকাংশেই নিরসন সম্ভব। দীর্ঘ সময় পানিপ্রবাহ বন্ধ থাকায় খালে জমে থাকা আবর্জনা অপসারণ এবং পানির সঠিক নিকাশি নিশ্চিত করা জরুরি।
- খাল পুনঃখনন করে প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্থ ও গভীরতা ফিরিয়ে আনা।
- মাঝখানের বক্স কলভার্ট ও স্লুইসগেট পূর্ণ ক্ষমতায় নির্মাণ ও সংস্কার।
- খাল-নালা পরিষ্কার ও আবর্জনা অপসারণের তৎক্ষণাত উদ্যোগ গ্রহণ।
- স্থানীয় কৃষক, স্বাস্থ্যবিষয়ক ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বিত মনিটরিং।
পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক শাখা সূত্র গত অনুষঙ্গে জানায়, প্রকল্প অনুশীলনে বাস্তবায়িত কয়েকটি উপাদান ও প্রকৃতির অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের ফলে বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে—তবে তারা এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচী বা নতুন উদ্যোগের তথ্য জানায়নি।
এই সমস্যা সমাধান না হলে স্থানীয়দের আর্থ-সামাজিক ক্ষতি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে—বিশেষ করে বর্ষাকালীন জলাবদ্ধতা কৃষিকাজে প্রভাব ফেলে ফলে বারবার ক্ষতির সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক বৎসরে এলাকায় গৃহস্থালি ও কৃষিজাত বর্জ্যের জলপথে জমা বাড়ায় এই ঝুঁকি আরো বাড়ছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও পাউবোকে দ্রুত প্রকৃত পরিমাপ-ভিত্তিক পুনঃখনন, স্থায়ী পানি নিকাশির পরিকল্পনা ও স্থানীয়দের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বাসিন্দারা। পটুয়াখালী অঞ্চলে জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা রক্ষায় বিষয়টি এখনই নজরে আনা প্রয়োজন।
সঞ্জয় মজুমদার, পটুয়াখালী প্রতিনিধি