সংকটের পরিসর
নরসিংদীর শিল্প এলাকা ও সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের কাছে যে গ্যাস সংকট শুরু হয়েছে, তা অনেকটি কারখানার উৎপাদন বন্ধে এবং আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ও জরুরি পর্যবেক্ষণের তথ্য অনুযায়ী নরসিংদীতে মোট মিলিয়ে ৪ হাজারের বেশি কারখানা রয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৩ হাজারটি টেক্সটাইল, ডাইং, সাইজিং, স্পিনিং ও পোশাকখাতের কারখানা।
কারখানায় বাস্তব চিত্র
গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ফলে নরসিংদীর অনেক ইউনিট তিন দিন ধরে স্থবির। তথ্য অনুযায়ী তীব্র সংকটের কারণে শতাধিক কারখানা বন্ধ রয়েছে এবং অনেকে আংশিক ক্ষমতায় চলছে। কিছু কারখানা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে সীমিতভাবে উৎপাদন চালু রেখে দেয়।
- কমপক্ষে ৫০টি কারখানা আংশিক উৎপাদন চালু রাখতে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়াচ্ছে,
- অনেকে স্টিম বয়লার চালাতে কাঠ ব্যবহার করছেন যার কারণে প্রতিদিন প্রতি কারখানায় ১০ হাজার টাকার বেশি অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে,
- বহু ইউনিটে উৎপাদন কমে দেখা গেছে; স্থানীয় হিসাব মতে উৎপাদন হ্রাস প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত।
একক কারখানার উদাহরণ
চৌয়ালা শিল্প এলাকার পরিবেশনায় হক টেক্সটাইল ও ইউনিফিল টেক্সটাইলের শ্রমিকেরা স্টিম বয়লারে কাঠ জ্বালাতে দেখা গেছেন। হক টেক্সটাইলের বয়লার অপারেটর মো. শাখাওয়াত বলেছেন,
"আগে আমরা বয়লার চালু করতে ঝুটকাপড় ব্যবহার করতাম। কিন্তু ঝুটকাপড়ের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন কাঠ পোড়াচ্ছি।"
এ ধরনের ভূয়সী বিকল্প ব্যবহারে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় মোট উৎপাদনধর্মী প্রতিযোগিতা ও লাভ মার্জিন দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব
ব্যবসায়ীদের স্বতঃস্ফূর্ত ঘোষণায় জরুরি পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী চলমান সংকটে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতির অঙ্ক উঠে এসেছে। এই অঙ্ক স্থানীয় ও রপ্তানিমুখী উভয় দিকেই প্রভাব ফেলতে পারে—বিশেষ করে যেসব মিল রপ্তানি করেই বড় আয় করে।
| উপাদান | তথ্য |
|---|---|
| মোট কারখানা (আনুমানিক) | ৪ হাজার+ |
| টেক্সটাইল ও সংশ্লিষ্ট ইউনিট | ৩ হাজার (আনুমানিক) |
| গ্যাসনির্ভর কারখানা | প্রায় ৪০০ |
| দৈনিক আনুমানিক ক্ষতি | প্রতি দিন ≈ ৩০০ কোটি টাকা |
বড় মিলের অভিজ্ঞতা
মোমিন টেক্সটাইল মিলের উদাহরণ থেকে সংকটের তীব্রতা আরও স্পষ্ট হয়। মিলটির ১০ ইউনিটের মধ্যে সাতটি গ্যাস সঙ্কটে বন্ধ রয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিন তাদের প্রয়োজন হয় ২২ হাজার থেকে ২৩ হাজার ঘনফুট গ্যাস, কিন্তু বর্তমানে তারা পাচ্ছে মাত্র ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার ঘনফুট. এই অভাব রপ্তানির হার ও অর্ডার পূরণক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে—মিলটি শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামে কাপড় রপ্তানি করে।
স্থানীয় শিল্প সংগঠনের বক্তব্য
চৌয়ালা টেক্সটাইল শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসলাম ফকির টিবিএসকে বলেছেন,
"গ্যাস ছাড়া সাইজিং ও ডাইং কারখানা চালানো সম্ভব নয়। গত তিন দিন ধরে আমাদের কারখানাগুলোতে কোনো উৎপাদন হচ্ছে না।"
তার এ মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে কিছু কারখানা অবশ্যই বিকল্প ব্যবস্থায় চলাচল করছে, কিন্তু তা সার্বিকভাবে পর্যাপ্ত নয় এবং ব্যয়বহুল।
সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ ও প্রভাব
নরসিংদী একটি শিল্পনির্ভর জেলা; টেক্সটাইল ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র স্থানীয় কর্মসংস্থান ও রাজস্বের বড় অংশ বহন করে। গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হলে:
- কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়ে—কাজ কমলে শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মঘণ্টা কমে যেতে পারে,
- উৎপাদন খরচ বাড়ায় প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে,
- রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতীয় পর্যায়েও প্রভাব পড়তে পারে।
স্থানীয় শিল্প ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় ও স্থায়ী সমাধান না এলেই এই ক্ষতি ধারাবাহিকভাবে বাড়তে প্রবণ। সরকারের জরুরি জ্বালানি নীতির সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি গ্যাসসরবরাহ পরিকল্পনা প্রত্যাশিত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হবে বলে ব্যবসায়ীরা মন্তব্য করছেন।