গাইবান্ধার দু'টি বরাবরের মতো নগরকেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থিত বালিকা বিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় একজনও পাস করেনি—এমন তথ্য জেলা শিক্ষা ভবনে আলোচনার বিষয় হয়েছে। শতভাগ ফেল হওয়া সেই দুটি বিদ্যালয় হলো পলাশবাড়ীর মনোহরপুর ইউনিয়নের মনোহরপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং সাদুল্লাপুর উপজেলার উত্তর দামোদরপুর কাজীপাড়া নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়।
কী তথ্য পাওয়া গেছে
মনোহরপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এবারের পরীক্ষায় মোট ৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। বিদ্যালয় পরিচালনা ও কর্মীসংখ্যা ছাড়াও স্থানীয়রা জানিয়েছেন—বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন ১১ জন শিক্ষক ও ৫ জন কর্মচারী। তাদের সত্ত্বেও কাউকে পাস করাতে ব্যর্থতা ঘটেছে।
সাদুল্লাপুরের উত্তর দামোদরপুর কাজীপাড়া বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৫ জন শিক্ষার্থী; তারা সবাইই ফেল করেছেন বলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় নিশ্চিত করেছে। ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা ৭ জন এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ৬ জন রয়েছে।
| বিদ্যালয়ের নাম | পরীক্ষার্থী (এইবার) | পাস | শিক্ষক/কর্মচারী | প্রতিষ্ঠা/অবস্থা |
|---|---|---|---|---|
| মনোহরপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় | ৩ | ০ | ১১ শিক্ষক, ৫ কর্মচারী | প্রতিষ্ঠা: ১৯৯৭, এমপিওভুক্ত: ২০০৫, উচ্চমাধ্যমিকে উন্নীত: ২০২৫ |
| উত্তর দামোদরপুর কাজীপাড়া নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় | ৫ | ০ | ৭ শিক্ষক, ৬ কর্মচারী | স্থানীয়ভাবে পরিচালিত (প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতি) |
প্রতিষ্ঠান ও ফলাফল নিয়ে স্থানীয় বিবরণ
মনোহরপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহাদাত হোসেন জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানের এত বিস্ময়কর ফল আগে দেখা যায়নি। তিনি বলছেন, এবারের তিনজন পরীক্ষার্থী সবাই মানবিক বিভাগে ছিলেন এবং সকলেই গণিতে ফেল করেছেন। শিক্ষক-সুবিধার ব্যাঘাতকে তিনি একটি প্রধান কারণ হিসেবে দেখান—বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক ফারুক খালেক দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় কাজ করতে পারেননি এবং বর্তমানে তিনি একটি মামলায় কারাগারে থাকার কারণে ক্লাস গ্রহণ সম্ভব হয়নি।
“এ রকম বিপর্যয় আগে কখনও আমাদের ফলাফলে হয়নি,”
বিভিন্ন সময় বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয় ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি নিয়ে স্থানীয়ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। মনোহরপুর বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে বিদ্যালয়টি নিম্ন মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে উন্নীত হওয়ার পর সেই বছর ওই বিদ্যালয় থেকে ৬ জন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই পাস করেছিলেন। বর্তমানে বিদ্যালয়ে প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে—তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন।
জেলা পর্যায়ে তদন্ত ও প্রতিক্রিয়া
গাইবান্ধা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান বলেন, কেন এবং কী কারণে শতভাগ ফেল হয়েছে—এ বিষয়ে দুটি বিদ্যালয়ের প্রধানদের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। তিনি জানান, বিদ্যালয় দুটি পরিদর্শন করে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার কথায়, এমপিওভুক্ত বিদ্যালয় থেকে এমন ফলাফল একেবারেই অপ্রত্যাশিত।
“বিদ্যালয় দুটির প্রধানের কাছে কেন এমন হল তা জানতে বলা হয়েছে; স্কুল পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে,”
সাদুল্লাপুর উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম ঘটনাটিকে নিন্দনীয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং জেলা কর্মকর্তার নির্দেশে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান। ওই এলাকার কিছু অভিভাবক ও স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রধান শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায় ও পর্যাপ্ত শিক্ষণসম্পর্কিত কাজ পারফরম্যান্স না থাকায় ফল বিঘ্নিত হয়েছে।
সমস্যার মাত্রা ও সম্ভাব্য প্রভাব
- ছোট-ছোট বিদ্যালয়ে শিক্ষকের দীর্ঘকালীন অনুপস্থিতি পড়াশোনার শৃঙ্খলা ও ফলের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
- বহু ক্ষেত্রে এই ধরনের ফল অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যত পরিকল্পনাকে বেলেঘরে ফেলে দেয়; ফলে পুনরায় ভর্তি, বিকল্প শিক্ষা বা ভর্তির চেষ্টা ব্যাহত হয়।
- এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ে শিক্ষাকাজের মান যাচাই না হলে সরকারি অনুদান ও সহায়তা কার্যকারিতায় প্রশ্ন ওঠে।
স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগ যেভাবে পদক্ষেপ নেবে—স্কুল পরিদর্শন, তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রয়োজনে শিক্ষক নিয়োগ বা বদলি—এই বিষয়গুলো এখন প্রধান হৃদ্যতার দাবি। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে তা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় গড়াতে পারে।
ঘটনাটি শিক্ষা ব্যবস্থার মনোযোগ দাবি করে—বিশেষ করে মনোহরপুর ও উত্তর দামোদরপুরের মতো গ্রামীণ স্কুলগুলোর শিক্ষকব্যবস্থাপনা, নিয়মিত ক্লাস গ্রহণ ও শিক্ষাসামগ্রী নিশ্চিতকরণে তৎপরতা বাড়াতে হবে।