গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাট-বাজারে এই মৌসুমে প্রতিপোন চারা (২০ গোন্ডা) কেনাবেচার দাম বেড়ে বসেছে। মাঠ পর্যায়ের দেখা-শোনা এবং হাটে সরেজমিন প্রতিবেদনে জানা যায়, বাজারে চারা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দামে, যা সাধারণত এ সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেশি।
চাহিদা-বিতরণে অস্বাভাবিক চাপ
জেলা ও উপজেলার নিম্নাঞ্চলের কৃষকরা সাধারণত নিজেরাই চারা উৎপাদন না করে উঁচু এলাকার কৃষকদের উদ্বৃত্ত চারায় নির্ভর করে থাকেন। কিন্তু এবার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের কৃষকদের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ সঙ্কটে পড়েছে এবং হাটে বস্তাভর্তি করে চারা নিয়ে এসে বিক্রি করছে উঁচু এলাকার চারা বিক্রেতারা। অনেক ক্ষেত্রেই মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালরা কৃষকের কাছ থেকে চারা কেনার অজুহাতে অধিক মূল্য আদায় করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
হাট-বাজারের সনাক্ত বিক্রেতারা জানিয়েছেন যে রিকশা-ভ্যান ও বাইসাইকেলে করে বস্তাভর্তি করে চারা এনে বিক্রি করা হচ্ছে। ক্রেতারা ক্ষেতের মান ও জাত যাচাই করে পছন্দসই চারা কিনছেন, ফলে দামের ওপর চাপ বাড়ছে।
কৃষক ও বিক্রেতাদের বক্তব্য
"আমার জমির বীজতলায় চারা উৎপাদন করা হয়। নিজের জমিতে চারা লাগানো হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত চারাগুলো হাটে নিয়ে এসে বিক্রি করেছি,"
ধাপের হাটের চারা বিক্রেতা আব্দুল প্রতিবেদককে বলেন যে তিনি নিজের জমির বীজতলায় অতিরিক্ত উৎপাদিত চারাগুলো বিক্রি করছেন। একই সঙ্গে চারা বিক্রি সংক্রান্ত ইজারা ও মধ্যস্বত্বভোগী পাওনা সম্পর্কে তিনি জানান, প্রতিপোন বিক্রি বাবদ ইজারাদারকে পৃথকভাবে অর্থ দিতে হচ্ছে।
চারা ক্রেতারা জানিয়েছেন, "এ বছর আমরা ২ বিঘা জমিতে রোপা আমন ধান আবাদ করার প্রস্তুতি নিয়েছি, কিন্তু নিজেদের বীজতলা না থাকায় উঁচু এলাকা থেকে চারা কিনতে হচ্ছে। প্রতিপোন চারা কেনার জন্য আমরা প্রতি পোন হিসেবে বেশি খরচ করতে বাধ্য হচ্ছি।" — কামারজানি চর এলাকার সাজেদুল হকের কথ্য উল্লেখ।
লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জন: জেলা কৃষি অফিসে কী বলছে?
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৩৩ হাজার ১৪০ হেক্টর ছিল রোপা আমন আবাদর লক্ষ্যমাত্রা। এপর্যন্ত জেলার অর্জন হয়েছে ৯৫ হাজার হেক্টর। এছাড়া বীজতলার উৎপাদিত চারা থেকেই লক্ষ্যমাত্রার পূরণে রয়েছে ৮ হাজার ৩০০ হেক্টর সমতুল্য চারার আশা।
| বিবরণ | পরিমাণ (হেক্টর) |
|---|---|
| লক্ষ্যমাত্রা | ১,৩৩,১৪০ |
| এখন পর্যন্ত অর্জন | ৯৫,০০০ |
| বীজতলার উৎপাদিত চারা (সম্ভাব্য) | ৮,৩০০ |
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আসাদুজ্জামান জানান, নিম্নাঞ্চলের চাহিদা বেশি থাকায় হাটে চারা মূল্য বাড়ছে। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন যে বীজতল মাঠ থেকে আরও উৎপাদন বাড়ানো এবং সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা চলছে।
কৃষকের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
- উচ্চ চারা মূল্য কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়াবে, যা শেষ পর্যন্ত লাভের মার্জিন কমাতে পারে।
- চারা না পেলে বা দাম বেশি হলে নির্ধারিত জমি আবাদ থেকে বাদ পড়ার সম্ভাবনা আছে।
- মধ্যস্থতাকারী দালালদের মুখে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কৃষক খাজা মিয়া জানান, নিজের জমি না থাকায় প্রতিবেশীর জমি বর্গা নিয়ে ২ বিঘায় চারা রোপণের পরিকল্পনা করেছেন; তাতে তিনি ৫ হাজার টাকার মতো খরচ করে চারা কিনেছেন। তিনি ভোক্তা ও বাজার ভরসার অভাবে উদ্বিগ্ন।
সম্ভাব্য সমাধান ও পরামর্শ
জেলা কৃষি বিভাগের ব্যাখ্যায় দেখা যায় যে প্রয়োজন হলে বীজতলা সম্প্রসারণ, সঠিক বণ্টন ও স্থানীয় পর্যায়ে চারা উৎপাদন বাড়ানোই দ্রুত সমাধানের পথ। এছাড়া কৃষককে সরাসরি উৎপাদকদের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণও জরুরি।
স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় সংগঠিত করে নিজস্ব বীজতলা বা সমবায় ভিত্তিতে চারা উৎপাদন বাড়ালে ভবিষ্যতে এমন চাহিদা-অপ্রতুলতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে বলে বিশ্লেষণ করা হয়। বর্তমানে চারা সংকট ও দাম বৃদ্ধির ফলে গাইবান্ধার নিম্নাঞ্চলের অনেক কৃষক শুরুর ধাপেই উদ্বিগ্ন এবং জেলা পর্যায়ে দ্রুত কার্যক্রম প্রত্যাশা করছেন।