চাঁদপুর সদর উপজেলার উত্তর ইচুলী এলাকায় ২০১৮ সালের ১৬ নভেম্বর পরিমণ্ডিত এক পারিবারিক খুনের ঘটনায় পুলিশের তদন্ত ও দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর বুধবার (১৩ আগস্ট) জেলা ও দায়রা জজ আদালত অপরাধী মহলের জন্য কঠোর শাস্তি ঘোষণা করেছেন। আদালত অভিযুক্ত মো. হোসেন গাজী (৩৮) কে জানমালের সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন এবং এক লাখ টাকা জরিমানাও অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। রায় ঘোষণা করলে আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনা ও তদন্তের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
দলিলভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, দণ্ডপ্রাপ্ত হোসেন গাজী হলেন মৃত মুছাব্বর গাজীর ছেলে। আদালতে আদালতী পর্যায়ের নথি থেকে জানা গেছে যে মাদকাসক্তি ও মাদক কেনার টাকার জন্য প্রায়ই তিনি তার বাবার সঙ্গে ঝগড়া করতেন এবং তাঁকে মারধর করতেন। পরিবার তাকে মাদকসেবন বন্ধ করতে ঢাকার একটি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা করিয়েও ফেলেছিল, কিন্তু সেখানকার চিকিৎসা কাজে লাগেনি।
২০১৮ সালের ১৬ নভেম্বর সকাল সাড়ে আটটার দিকে হঠাৎ ঘরে শুয়ে থাকা মুছাব্বর গাজীকে ধারালো দা দিয়ে মাথায় কোপ দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে তিনি গুরুতর রক্তাক্ত হন। শয্যা থেকে দাঁড়ানোর পরও অততারে আবার কোপ দেওয়া হয়। হাত দিয়ে ঠেকাতে গেলে তাঁর একটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান; প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে ওয়ারল্যাস বাজার এলাকায় তার মৃত্যু হয়।
বিচার ও সাক্ষ্য-প্রমাণ
মামলার তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন তখনকার চাঁদপুর সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোমিনুল ইসলাম। তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এরপর পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে ১৭ নভেম্বর আদালতে পাঠায়।
“মামলাটির বিচার চলাকালে আদালত ১৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন। সাক্ষ্য-প্রমাণ, মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা এবং আসামির অপরাধ স্বীকারের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আদালত এ রায় দিয়েছেন,”
এ যোগ্য মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর কোহিনুর রশিদ। আদালত কাজকর্ম শেষে রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া
উত্তর ইচুলীসহ আশপাশের গ্রামাঞ্চলে এই ঘটনার স্মৃতি এখনও তাড়িত। প্রতিবেশীরা বলছেন, বিভক্ত পরিবারের উপর মাদকাসক্ত সন্তানদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব সম্প্রদায়ের জন্য উদ্বেগের কারণ। স্থানীয়রা আশা করছেন রায় প্রাপ্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব বহন করবে এবং ভবিষ্যতে এমন কড়া অপরাধকারীর হাত থমাতে সহায়ক হবে।
- রায়: যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা (অনাদায়ে ৬ মাস অতিরিক্ত সশ্রম কারাদণ্ড)।
- অভিযুক্ত: মো. হোসেন গাজী, বয়স ৩৮, উত্তর ইচুলী, চাঁদপুর সদর।
- নিহত: মুছাব্বর গাজী (বাবা), মৃত্যুর তারিখ ১৬ নভেম্বর ২০১৮।
| তারিখ | ঘটনা |
|---|---|
| ১৬ নভেম্বর ২০১৮ | মুছাব্বর গাজীকে ঘরের ভেতরে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা; হাসপাতালে নিয়ে গেলে পথেই মৃত্যু। |
| ১৭ নভেম্বর ২০১৮ | অভিযুক্ত গ্রেফতার ও আদালতে সোপর্দ। |
| ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | অভিযোগপত্র দাখিল। |
| ১৩ আগস্ট (বর্তমান বছর) | সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজের রায়: যাবজ্জীবন ও জরিমানা। |
এ ঘটনায় নিহতের বড় ছেলে মো. আলম গাজী বাদি ছিলেন। মামলাটির বিচারকাজে আদালত সাক্ষ্যগ্রহণ ও নথির আলোকে দণ্ড নির্ধারণ করেন। রায়ের পর স্থানীয় আইনপ্রয়োগকারী ও সমাজকর্মীরা বলছেন, মাদকাসক্তি ও পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে গ্রামীণ-শহর উভয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং নিরাময় কেন্দ্রগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।
চাঁদপুরের পাশাপাশি আশপাশের অঞ্চলের মানুষ রায়ে এক মাপকাঠি দেখছে—পারিবারিক জমজমাট জীবনে মাদকের অনুপ্রবেশ কতটা ভেঙে দিতে পারে। বিচারিক রায় এখন পরিবারে একটি দণ্ডের ন্যায় কার্যকর হবে; তবু ক্ষতগুলো সময়সাপেক্ষে সারবে।
— চাঁদপুর প্রতিনিধি, WE NEWS