দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের মীর মহসীন আলী চৌধুরী চাকরিজীবন ছেড়ে স্থানীয়ভাবে প্রাণিসম্পদ বিনিয়োগ করে সফল খামারি হিসেবে পরিচিতি গড়েছেন। রাজধানীতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তিনি; তবে লোকাল উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে সংগৃহীত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তাকে গ্রামে ফেরিয়ে এনেছে।
ছোট থেকে বড়: জমিটুকু বাড়িয়ে খামার প্রসার
সংবাদিক পরিদর্শনে দেখা যায়, মহসীনের খামারটি এখন ১০৭ শতক জমির ওপর বিস্তৃত। শুরু করেছিলেন মাত্র ১৩টি দেশি গরু নিয়ে; বর্তমানে খামারে আছেন দেশের ও বিদেশি জাতের ৪৫টি গরু এবং ৫২টি মহিষ—মোট ৯৭টি বৃহৎ গবাদি পশু। তিনটি বিশাল শেড, একটি গুদামঘর ও নানা ধরনের খাদ্য সংরক্ষণ ও চারণব্যবস্থা তৈরি করে খামারটি পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
দৈনন্দিন পরিচালনা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের চিত্র
সকালে ভোরের আলো ফোটার আগেই খামারে কর্মজীবন শুরু হয়। শ্রমিকরা খড় কাটায়, খাদ্য মিশায় এবং নির্দিষ্ট চারের প্যাকেজ করে পশুকে দেয়। খামারে কৃত্রিম ঝরনার নিচে মহিষেরা গোসল করানো হয়; শেডে গরু-মহিষ মোটাতাজাকরণের কাজ চলছে—সবই নিয়মিত ও সাংগঠনিকভাবে। পাইকারিরা খামার ঘুরে দেখেন; দরদাম মিললে সেখানেই দর-কষাকষি সম্পন্ন হয়।
ব্যক্তিগত পটভূমি ও উদ্যোগের সূত্র
মীর মহসীন লেখাপড়া শেষ করে ২০০৭ সালে দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ঢাকায় কর্মকালীন সময়ে তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান বিষয়ক কাজে যুক্ত একটি সংস্থায় কাজ করেছেন; সেখান থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের প্রভাবে খামারি কাজ শিখে গ্রামে ফিরে পরিকল্পনা চালু করেন।
‘পড়ালেখা শেষ করে কয়েক বছর চাকরি করেছি, কিন্তু মন বসছিল না। ছোটবেলা থেকেই বাবাকে গরু-ছাগল পালন করতে দেখেছি। তাই সাহস করে অল্প পুঁজি নিয়েই খামার শুরু করি,’
জানা যায়, শুরুতে জমি ছিল মাত্র ৫০ শতক; ধারাবাহিক আয় থেকে জমি ক্রয় করে বর্তমানে মোট ১০৭ শতক জমি যুক্ত করেছেন। এই সময়ে তিনি দুটি নতুন শেড নির্মাণ ও একটি গুদামঘর নির্মাণ করেছেন।
স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান—একটি প্রভাব মূল্যায়ন
খামারটি স্থানীয় শ্রমিক নিয়োগে অবদান রাখছে—দেহে পরিশ্রমী কর্মীদের নিয়মিত কাজ ও প্রাণিসম্পদ সংক্রান্ত কাজের চাহিদা তৈরি হয়েছে। পাইকারি ক্রেতাদের আগমন এবং স্থানীয় বাজারে পশুর সরবরাহে খামারটির ভূমিকা গ্রামীণ কৃষি-অর্থনীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রতিফলিত হচ্ছে।
- জমির আয়তন: ১০৭ শতক
- গরু: ৪৫টি (দেশি ও বিদেশি জাত)
- মহিষ: ৫২টি (ভারতীয় সংকর জাতসহ)
| সূচক | সংখ্যা |
|---|---|
| শুরুতে গবাদি পশু | ১৩টি দেশি গরু |
| বর্তমান মোট গবাদি | ৪৫ গরু + ৫২ মহিষ = ৯৭ |
চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ
স্থানীয় কৃষি ও পশুপালন খাতের ইতিবাচক পরিবর্তন সত্ত্বেও কিছু বিষয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে—উদাহরণস্বরূপ পশুখাদ্য নির্ভরতা, সঠিক চিকিৎসা ও ভ্যাকসিন সেবা, এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত করা। তবুও আধুনিক ব্যবস্থাপনা, সুপরিকল্পিত খাদ্যদাতা ব্যবস্থা ও কৃত্রিম ঝরনা বসানোর মতো উদ্যোগ খামারকে প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই করেছে।
স্থানীয় শিক্ষণ ও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা
মহসীনের উদ্যোগটি স্থানীয় পশুপালকদের কাছে একটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে—বিশেষ করে যারা নগদ পুঁজির সীমিততা ও দক্ষতাহীনতার কারণে বড় হওয়ার পথে বাধায় পড়ে। মডেল খামারের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ, বিদ্যমান চ্যানেল ব্যবহার করে বাজারসংযোগ ও সমবায় প্রতিষ্ঠার মতো উদ্যোগ গড়ে উঠলে গ্রামীণ স্বনির্ভরতা বাড়তে পারে।
মোটকথা, মীর মহসীন আলী চৌধুরীর গল্পটি বলছে—সঠিক অভিজ্ঞতা, স্থির লক্ষ্য ও ধাপে ধাপে বিনিয়োগে গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনার পথ রয়েছে। স্থানীয় সরকার, উন্নয়ন সংস্থা ও কৃষি সম্প্রসারণ সেবা যদি সহায়তা করে, তাহলে এ ধরনের ছোট উদ্যোক্তারা বড় পরিসরে শ্রেণীভিত্তিক পরিবর্তন আনতে পারে।