মনপুরায় স্থাপনাযোগ্য বেড়িবাঁধে কয়েক দফা ক্ষত — ক্ষতি ও উদ্বেগ
ভোলা জেলার মনপুরা উপজেলা সংরক্ষণে নির্মিত হচ্ছে প্রায় ৫০.৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় বেড়িবাঁধ, যার আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শুরু হওয়া এ প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল উপকূলটি সমুন্নত রাখা এবং স্থানীয় কৃষিজমি, বসতি ও যোগাযোগ রক্ষা করা। কিন্তু গত কয়েক মাসে প্রকল্পের বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ ধসে পড়ার ঘটনা ঘটেছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে মনপুরা ইউনিয়ন, হাজিরহাট ইউনিয়ন ও দক্ষিণ সাকুচিয়া এলাকার নির্মিত অংশগুলোতে বালু সরা এবং বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। ধসে পড়া মাটি ও বালু আমনখেতে পড়ে ধান নষ্ট হওয়া, এবং কয়েকজন কৃষকের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই বেড়িবাঁধ ধসে পড়ছে, কারণ ব্যবহৃত বালুর মান অনুপযোগী এবং প্রধান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সরাসরি কাজ না করে সাব-ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করাচ্ছে।
কোথায় কোথায় ক্ষতি হয়েছে
- মনপুরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম পাশের বেড়িবাঁধ
- হাজিরহাট ইউনিয়নের ২, ৩ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডে নির্মিত অংশ
- দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের সূর্যমুখী এলাকা
স্থানীয়রা আরও জানান গত মঙ্গল ও বুধবার টানা বৃষ্টির সময় হাজিরহাট ইউনিয়নের ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিমাংশে নতুন নির্মিত বেড়িবাঁধে ধস পড়ে। ফলে অনেকে অস্থায়ীভাবে আতঙ্কে রয়েছেন এবং জমি-ফসলের ক্ষতির বিষয়ে উদ্বিগ্ন।
প্রকল্প ও ঠিকাদারদের অবস্থা
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের কাজের মেয়াদ ২০২৭ সালের মধ্যে হস্তান্তরের কথা। কাজ পরিচালনা করছে ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান: এনবিই, ওটিবিএল, জিসিএল, এলএকে এসএসএ, পিডিএল ও ওয়েস্টার্ন। এনবিই ও ওটিবিএল মিলে একটি প্রয়োজিত নামে, ফারিসা, কাজ করছে। সূত্রে বলা আছে—অন্যান্য ঠিকাদাররাও বিভিন্ন সাব-ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করাচ্ছেন।
| নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান | মন্তব্য |
|---|---|
| এনবিই + ওটিবিএল (ফারিসা) | প্রকল্পে বড় অংশ নিয়োজিত |
| জিসিএল, এলএকে এসএসএ, পিডিএল, ওয়েস্টার্ন | বিভিন্ন স্থানে কাজ করছে |
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ নিজেরা করে না—সাব-ঠিকাদার কাজে নিয়োজিত থাকায় নির্মাণের মান কমে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে বৃষ্টিতেই বাঁধ ধসছে এবং জমিতে বালু পড়ে ফসল নষ্ট হচ্ছে। এলাকার কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, নাম প্রকাশ না করে, জানালেন মেঘনা নদীর নিম্নমানের বালুই বেড়িবাঁধ নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে।
“বেড়িবাঁধের কাজ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রকৌশলীদের সামনে নিয়ম মেনে করা হচ্ছে।”
এই বিবৃতি প্রকল্পে দায়িত্বরত একজন প্রকৌশলীর কথাবার্তার অংশ; তবে স্থানীয়দের অভিযোগ ও ক্ষতির চিত্র বিবেচনায় তদারকি ও মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। পাউবো কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত অংশ তড়িঘড়ি করেই মেরামত করার নির্দেশ দিয়েছে এবং ঠিকাদারদের কাজ পুনরায় খতিয়ে দেখতে বলেছে।
স্থানীয় প্রভাব ও পরবর্তী করণীয়
মনপুরায় বেড়িবাঁধের দুর্বলতা কেবল অবকাঠামো সমস্যাই নয়; এর সরাসরি ফল হচ্ছে কৃষি উৎপাদনে ক্ষতি, জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। ক্ষতিগ্রস্ত আমনখেতে বালু পড়ে ধান নষ্ট হওয়ায় অনেক পরিবারের আয়ের ক্ষতি হতে পারে। অতিবৃষ্টি বা টানা ঝড় হলে আরও বড় ধরনের ধস ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে, যা স্থানীয় বসত ও রাস্তাঘাটেও প্রভাব বিস্তার করবে।
স্থানীয়রা দাবি করেন—পাউবোকে প্রকৃত তদারকি বাড়িয়ে মানসম্মত উপকরণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে; প্রধান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানদের সরাসরি কাজ করাতে হবে; এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা দিতে হবে।
এসময় পরবর্তী পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে পাউবো ও ঠিকাদারদের মধ্যে কাজের মান পুনর্মূল্যায়ন, স্থলাভিযান ও ব্যবহৃত উপকরণের পরীক্ষা, এবং স্থানীয় জনগণকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বিস্তারিত তথ্য জানানো। প্রকল্পের সময়সীমা মাথায় রেখে দ্রুত ও কার্যকর নির্দেশনা না হলে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় ও কড়াকড়ি কার্যক্রমই এখন প্রয়োজনীয়, যাতে উপকূলীয় এলাকাবাসীর জীবিকা ও সম্পদ রক্ষা পায়।