ভোলা ও বরিশাল অঞ্চলসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক নেটওয়ার্কে নতুন সেতু নির্মাণে জাপানি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মিয়াগাওয়া কেনসেটসু কোম্পানি লিমিটেড অংশীদার হিসেবে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে পিপিপি (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব) মডেলে ভোলা-বরিশাল, শরীয়তপুর-চাঁদপুর ও ভোলা-লক্ষ্মীপুর সেতু প্রকল্পে বিনিয়োগ, নকশা, নির্মাণ ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের প্রস্তাব দিয়েছে।
সেতু বিভাগে সাক্ষাৎ ও আলোচনা
জাপানি প্রতিনিধিদল এবং বাংলাদেশের স্ট্যালিয়ন গ্রুপের প্রতিনিধি মঙ্গলবার সেতু বিভাগে সেতু সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। বৈঠকে স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ এবং মিয়াগাওয়া কেনসেটসুর ওভারসিজ ডিরেক্টর তোজি নিশিদা ৬ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন।
বৈঠকে সেতু সচিব দেশের সাম্প্রতিক যোগাযোগ অবকাঠামোর অগ্রগতির বর্ণনা দেন এবং গত কয়েক বছরে বাস্তবায়িত বড় প্রকল্পগুলোর—যেমন পদ্মা সেতু, যমুনা সেতু ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের—সাফল্য ও সামাজিক-আর্থিক প্রভাবের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশীয় অর্থনৈতিক বিকাশ বজায় রাখতে আধুনিক ও দক্ষ যোগাযোগ অবকাঠামো অপরিহার্য এবং পিপিপি মডেল মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
“ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রথম পিপিপি ভিত্তিক প্রকল্প এবং এর বাকি অংশ দ্রুত সম্পন্ন করতে সরকার বদ্ধপরিকর।”
প্রস্তাবনা ও করণীয়
প্রতিনিধিদল প্রস্তাবিত সেতু প্রকল্পগুলোর বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা, বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করে। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে আগামিতে কারিগরি পর্যায়ে কাজ এগিয়ে নেয়ার ওপর দুই পক্ষ সম্মত হয়। বৈঠকে আন্তর্জাতিক বাজারে দক্ষ বেসরকারি অংশগ্রহণ প্রকল্প বাস্তবায়নের মান বাড়াতে সহায়ক হবে—এমন মনোভাব দেখা যায়।
স্থানীয় পর্যায়ে এগুলো বাস্তবায়িত হলে নিন্মলিখিত প্রভাব পড়তে পারে:
- সড়ক ও যোগাযোগ ঝামেলা কমবে: ভোলা ও বরিশালের মধ্যে সরাসরি সংযোগ সৃষ্টি হলে যাতায়াত দ্রুততর হবে।
- আর্থিক প্রবাহ বাড়বে: পণ্য পরিবহন খরচ কমলে উপকূলীয় সবজী, মাছ ও অন্যান্য পণ্যের বাজারে সুবিধা হবে।
- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হবে: বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের সময় দ্রুত উদ্ধার ও সরবরাহে সুবিধা হবে।
স্থানীয় প্রেক্ষাপট ও প্রত্যাশা
ভোলার মতো দ্বীপ ও উপকূলীয় জেলায় স্থায়ী সেতু নির্মাণ সুদূরপ্রসারী সুযোগ সৃষ্টি করে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, সেতুর কারণে পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ কমলে কাঁচামাল ও উৎপাদন খরচে প্রভাব পড়বে, ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতা বাড়বে। তবে একই সঙ্গে স্থানীয় পরিবেশগত প্রভাব, জমির মজবুতিলাভ, মাইগ্রেশন ও সামাজিক পরিবর্তন কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে—এসব বিষয়েও প্রতিপক্ষ ও কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ব্যাখ্যা আশা করা হবে।
সেতু বিভাগের সঙ্গে আলোচনা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ভবিষ্যতে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর, যানজটমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি। সেতু বিভাগ মনে করায় যে, পিপিপি মডেলে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা সম্পন্ন বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও মান নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
| প্রস্তাবিত সেতু প্রকল্প | সম্ভাব্য অংশীদার | মডেল |
|---|---|---|
| ভোলা-বরিশাল | মিয়াগাওয়া কেনসেটসু + স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটাল | পিপিপি |
| শরীয়তপুর-চাঁদপুর | মিয়াগাওয়া কেনসেটসু + স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটাল | পিপিপি |
| ভোলা-লক্ষ্মীপুর | মিয়াগাওয়া কেনসেটসু + স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটাল | পিপিপি |
পরবর্তী ধাপ ও স্থানীয় উদ্বেগ
বৈঠকের শেষে সেতু বিভাগ ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ জানায় যে, পিপিপি মডেলে সম্ভাব্য নতুন প্রকল্পগুলো নিয়ে ভবিষ্যতে কারিগরি পর্যায়ে নিয়মিত আলোচনা ও মূল্যায়ন চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মতি হয়েছে। স্থানীয় মানুষের জন্য প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন শুরু হলে পরিবেশগত মূল্যায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া জোরদার করা হবে—এমন প্রত্যাশা জাগে।
ভোলার মতো দুরবস্থা-প্রবণ অঞ্চলে প্রকল্পগুলো সফল হলে স্থানীয় জীবিকা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার টেকসই উন্নতি আসবে। তবে গ্রাম পর্যায়ের নাগরিকদের উদ্বেগ, প্রতিবন্ধকতা ও পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসন ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত পরিকল্পনা ও অংশগ্রহণমূলক আলোচনা করতে হবে।
আমরা সুত্রের বরাতে জানাতে পারি যে, এ মুহূর্তে প্রকল্পগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তি বা নির্মাণ সূচি এখনও চূড়ান্ত হয়নি; করণীয় প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করবে। স্থানীয় জনগণ ও ব্যবসায়ীদের জন্য এগুলো কোন দিক থেকে সুবিধা–অসুবিধা আনবে, সে বিষয়ে প্রশাসনের কাছ থেকে অগ্রগতি জানার অপেক্ষা রয়েছে।