রংপুরের বদরগঞ্জ পৌরশহরের ভাড়ারদহ নামের বিলটি পুনরুদ্ধার করে মৎস্য অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে তোলার পর কয়েক বছরের মধ্যে আবার সংকটের মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের বেশিরভাগ বক্তব্য মিলিয়ে জানা যায়, বিলের জলের ওপর কচুরিপানা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হওয়ায় জলজ পরিবেশ এবং পাখি ও মাছের প্রজাতি এখন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। একই সঙ্গে বিলের পাড় এলাকায় স্থানীয় সন্ত্রাস ও মাদকসেবীদের উপস্থিতি স্থানীয়দের ভ্রমণ ও অবকাশযাপন বন্ধ করে দিয়েছে।
প্রকল্প ইতিহাস ও বর্তমান পরিসংখ্যান
স্থানীয় প্রশাসন এবং বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ২০২১ সালে প্রায় ৪৯,৫৬,০০০ টাকা ব্যয়ে ভাড়ারদহ বিল খনন করে। বিলটির মোট আয়তন ছিল প্রায় ১১.৫৯ একর ও যেখানে গড়ডাঙ্গী নদী ও চিকলী নদীর মিলনস্থল থেকে উৎপত্তি হওয়া জল জমেছে। খননের পর বিলটি পাখির আবাসস্থল হিসেবে ফিরে এসেছে; পাড়ে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়েছিল, স্থানীয়রা সেখানে পাখির কোলাহল ও দর্শনার্থীদের পদচারণার কথা মনে করেন।
সমস্যার প্রকৃতি ও সামাজিক প্রভাব
কিন্তু সম্প্রতি ওই পরিস্থিতে একাধিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রথমত, বিলের পানির ঘনভাগে কচুরিপানা ছড়িয়ে পড়ায় পানির মুক্ত অভয়াশ্রম বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পাখি ও জলজ প্রাণীর আবাসিক সহজলভ্যতায় দুরবস্থা দেখা দিয়েছে এবং মাছের সংখ্যা কমছে। স্থানীয়রা বলছেন, বিলের পানিতে দূষণ চিন্তিত করেছে—পানির মান খারাপ হওয়ার কারণে মৎস্য মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।
দ্বিতীয়ত, বিলের পাড় এলাকায় অনিচ্ছাকৃতভাবে অপরাধ ও মাদকসেবীদের আড়াল গড়ে ওঠায় জনসাধারণের চলাচল সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। পর্যটক ও স্থানীয়রা নিরাপত্তার ভয়ে বিল সংলগ্ন এলাকা ঘোরাঘুরি থেকে বিরত চলেছেন। এতে এলাকার সামাজিক জীবন ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর প্রভাব পড়ছে।
প্রশাসনিক দায়িত্ব ও প্রতিবন্ধকতা
বিএমডিএর উপ-সহকারী প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন যে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় কচুরিপানা অপসারণের জন্য পুনরায় অর্থ বরাদ্দের আবেদন করা হয়েছে, কিন্তু তাতে এখনো কাজ শুরু হয়নি। তিনি বলেন,
“প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় কচুরিপানা সরানোর জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়ে বার বার আবেদন করছি কিন্তু কোন কাজ হচ্ছেনা।”
বিলের পাহারাদার আতিয়ার রহমান যখন যোগাযোগ করা হয়, তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। অপরদিকে পুলিশ সূত্রে জানা যায়,ওসি হাসান জাহিদ সরকার মৌখিকভাবে স্বীকার করেছেন যে বিলে মাদকসেবীদের আড্ডা আছে, তবে সেখানে অভিযান করা কঠিন কারণ পুলিশ দেখা মাত্র মাদকসেবীরা দৌড়ে পালিয়ে যায়। ওসির কথায়,
“ভাড়ারদহ বিলে মাদকসেবীদের আখড়া রয়েছে বিষয়টি জেনেছি। কিন্তু সেখানে অভিযান চালানো কঠিন। কারণ পুলিশ দেখলেই মাদকসেবীরা চারদিক দিয়ে দৌড়ে পালায়।”
প্রভাবিতরা—স্থানীয়রা কী বলছেন
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও দর্শনার্থীরা বলছেন, যে বিলটি একসময় পাখি ও পর্যটকদের আকর্ষণ করত, আজ সেটি দিয়ে কেউ নিরাপদভাবে ঘুরে দেখেন না। মাছ শিকার হয়ে যাচ্ছে, পাখির সংখ্যা কমেছে এবং পরিবেশগত সৌন্দর্য নষ্ট হয়েছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন যে যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে বিলটি আর পুনরায় সচল হওয়ার যোগ্য হবে না।
- জীববৈচিত্র্য সংকট: কচুরিপানায় ভরে পাখি ও মাছের আদি বাসস্থান ভেঙে যাচ্ছে।
- নিরাপত্তাহীনতা: পাড়ে মাদকসেবী ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম থাকার কারণে জনসমাগম কমে গেছে।
- প্রশাসনিক ব্যবধান: অর্থ বরাদ্দ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব প্রকৃত সমস্যাকে দীর্ঘায়িত করছে।
সম্ভাব্য ব্যবস্থা ও স্থানীয় প্রত্যাশা
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আঞ্জুমান সুলতানার বরাতে জানা যায়, তারা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা রয়েছে দ্রুত কচুরিপানা নিয়ন্ত্রণ ও বিলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পুনরায় মৎস্য কার্যক্রম ও পর্যটন উৎসাহিত করা হবে। তবে তা বাস্তবে পরিণত করতে অর্থসংস্থান, দায়িত্বশীল তৎপরতা ও নিয়মিত অনুপ্রবেশ রোধে কার্যকর পুলিশি তৎপরতা প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট যে ভাড়ারদহ বিল শুধু পরিবেশগত একটি সাইট নয়—এটি স্থানীয় জীবিকা, নিরাপত্তা ও সামাজিক বসবাসের একটি অঙ্গ। কর্তৃপক্ষ পর্যায়ক্রমিক ও দৃঢ় পদক্ষেপ না নিলে ক্ষতিটা দীর্ঘস্থায়ী হবে।