রাঙ্গাবালীর কাউখালী এলাকার চর সাইনবোর্ড সংলগ্ন সংরক্ষিত বনভূমি থেকে স্থানীয়রা গাছ কেটে মাটি কেটে বাঁধে ভেকু চালিয়ে তরমুজ চাষ শুরু করেছে—এমন অভিযোগে এলাকায় তীব্র আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন বিভাগ জানিয়েছে, ওই কাণ্ডে প্রভাবত প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টি ঝাউ, কেওড়া ও ছৈলাগাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে।
ঘটনার পেছনের বিরোধ ও বনবিভাগের দাবি
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের ৪ এপ্রিল চর সাইনবোর্ডের আশপাশের ৪১৫ একর এলাকা সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়। পরে সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির ম্যানগ্রোভ গাছ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় দশ হেক্টর জমিতে ঝাউসহ গাছ লাগানো হয়েছিল। জেলার প্রশাসন ওই এলাকার একাংশে ৩০ একর জমি দুই বছরের জন্য বন্দোবস্ত দেয়ায় সেটি কেন্দ্র করে বিরোধ শুরু হয়েছিল।
রাঙ্গাবালী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আমির হোসেন জানিয়েছেন, বন্দোবস্তপ্রাপ্তরা গত বছর থেকে তরমুজ চাষের চেষ্টা চালাচ্ছিল এবং শেষপর্যন্ত গত শনিবার বিকেলে আরিফ মীরের নেতৃত্বে মাটি খেকে বাঁধ নির্মাণ শুরু করে। বনকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বাধা দিলেও কাজ বন্ধ হয়নি বলে তিনি জানান। বন বিভাগ ইতিমধ্যে ঘটনার বিষয়ে দুটি মামলা দায়ের করেছে এবং মামলা চলমান রয়েছে।
স্থানীয়দের পদক্ষেপ ও প্রশাসনের চিঠি
বিষয়টি নিয়ে বন বিভাগ জেলা প্রশাসককে দুই দফা চিঠি দিয়েছে। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহিদুর রহমান মিয়ার স্বাক্ষরিত ১৫ অক্টোবরের চিঠিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট জমি বন বিভাগের ২০ ও ৪ ধারায় ঘোষিত বনভূমির অন্তর্ভুক্ত এবং সেখানে বন বিভাগের সৃজিত একাধিক বাগান আছে; এই কারণেই বন্দোবস্ত বাতিলের দাবি করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, অন্যথায় বন, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ঝুঁকি তৈরি হবে।
রাঙ্গাবালী থানায়ও ওই ঘটনার বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। জিডিতে আরিফ মীরসহ তিনজনের নাম উল্লেখ রয়েছে। বনকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, বনভূমি রক্ষা করতে গিয়ে তাদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে এবং জনবলসংকট থাকায় সবসময় সরাসরি অবক্ষেপ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অভিযুক্ত আরিফ মীর দাবি করেছেন, “সরকারের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নিয়েই আমরা সেখানে তরমুজ চাষের উদ্যোগ নিয়েছি।”
পরিণতি ও স্থানীয় উদ্বেগ
এই ঘটনার স্থানীয় ও পরিবেশগত নানা প্রভাব থাকতে পারে—বালুকাবেষ্টিত চরভূমি ও ম্যানগ্রোভ বাগান ভেঙে ফেলে মাটি, জলাধার ও জীববৈচিত্র্যে ক্ষতি হতে পারে। বন বিভাগ ইতোমধ্যেই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে; তবে বনরক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় তারা সব সময় কার্যকর ভাবে স্থাপন করা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে না।
- প্রতিবেদন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত গাছের সংখ্যা: প্রায় ২০০–৩০০টি গাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে।
- সমস্যিত ভূমির ইতিহাস: ২০১০ সালে ৪১৫ একর সংরক্ষিত বন ঘোষণা; ২০২১-২২ সালে ১০ হেক্টর গাছ রোপণ।
- বন্দোবস্তসংক্রান্ত বিবাদ: জেলা প্রশাসন ৩০ একর জমি দুই বছরের জন্য বন্দোবস্ত দেয়ার পর থেকে বিরোধ তীব্রায়।
- প্রযুক্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ: বন বিভাগ জিডি ও মামলা করেছে; জেলা প্রশাসককে বন্দোবস্ত বাতিলের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে।
ঘটনাপঞ্জি — সংক্ষিপ্ত সময়রেখা
| সাল/তারিখ | ঘটনা |
|---|---|
| ৪ এপ্রিল ২০১০ | চর সাইনবোর্ড অঞ্চলের ৪১৫ একর সংরক্ষিত বন ঘোষণা |
| ২০২১-২২ | প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে ঝাউনুসহ বিভিন্ন গাছ রোপণ |
| গত বছর | ৩০ একর জমি দুই বছরের জন্য বন্দোবস্ত দেওয়া হয় |
| গত শনিবার | ভেকু দিয়ে মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণ শুরু; ২০০–৩০০ গাছ কাটা বা উপড়ানো অভিযোগ |
এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দারা ও পরিবেশসম্মত নাগরিক সংগঠনের দাবি হচ্ছে—জলবায়ু ও সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় টেকসই ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের তৎপরতা বাড়াতে হবে। বন বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ না নিলে দীর্ঘমেয়াদে সৈকতক্ষয়, মাটির ক্ষয় ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হবে।
স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ ও সন্দেহভাজন কৃতকর্তাদের বক্তব্য থাকায় মামলাগুলো আদালতে বিচারাধীন। এ পর্যন্ত বনবিভাগ ও পুলিশ কৌশলগতভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন বলে দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে।
পটুয়াখালী থেকে রিপোর্টিং: পরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তা—এই দুই দিক থেকে ঘটনার উন্নতি নজরদারির দাবি রাখে।