নিয়ামতপুর উপজেলায় টানা দাবদাহ ও অনাবৃষ্টির ফলে চলতি আমন মৌসুমে লক্ষ লক্ষ টাকার ফলনক্ষতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। উপজেলা কৃষি বিভাগের কেন্দ্রীয় তথ্য অনুযায়ী আটটি ইউনিয়নের অধিকাংশ ক্ষেতেই এখন মাটিতে ফাটল দেখা যাচ্ছে এবং বহু ধানক্ষেত শুষ্ক হয়ে পড়েছে।
ক্ষেতের অবস্থা ও কৃষকের উদ্বেগ
ক্ষেত পরিদর্শনে দেখা গেছে, অনেক জমির মাটি চৌচির হয়ে গিয়েছে; রোদের তীব্রতায় ধানগাছের পাতা নুয়ে পড়েছে এবং গাছে বিবর্ণতা দেখা দিয়েছে। মাটি আদ্রতা ধরে রাখতে না পারায় কৃষকরা বিকল্প হিসেবে সেচ পাম্প ও শ্যালো মেশিন ব্যবহার করছেন। কিন্তু অতিরিক্ত সেচ দেওয়ার ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ও প্রান্তিক কৃষকেরা আর্থিকভাবে ভুগছেন।
পিরপুর গ্রামের কৃষক পলাশ আক্তার জানান, তিনি বারো বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন এবং সেচ দিতে হচ্ছে। সম্প্রতি ডিজেলের দাম লিটারে বাড়ায় সেচ খরচ অনেক বেড়েছে; তাই তিনি অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
কৃষি বিভাগের তথ্য ও পরামর্শ
উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এ বার নিয়ামতপুরে রোপা আমন চাষ করা হয়েছে মোট ৩১,০৪০ হেক্টর জমিতে এবং উপজেলার আটটি ইউনিয়নে ব্যাপকভাবে আমন আবাদ আছে। কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন বৃষ্টির পানি এখন অত্যন্ত জরুরি এবং কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীরা কৃষকদের নিয়মিত ক্ষেত পর্যবেক্ষণ এবং সঠিক পরিচর্যার পরামর্শ দিচ্ছেন, যাতে ক্ষতির পরিমাণ যাতে কমিয়ে আনা যায়।
আর্থিক প্রভাব
কৃষি দফতর সূত্রে বলা হয়েছে, চলতি মৌসুমে শুধু রোপা আমন চাষেই কৃষকদের উপর প্রায় ৩৭ কোটি ২৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা অতিরিক্ত সেচখরচের বোঝা পড়তে পারে—যা উৎপাদনব্যয়কে অনেকগুণ বৃদ্ধি করবে এবং লাভজনকতা কমিয়ে দেবে। বিশেষ করে যেসব ছোট ও প্রান্তিক কৃষকের কাছে অতিরিক্ত সেচের খরচ মেটানো সম্ভব হবে না, তাদের ক্ষেত-ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাবে।
- ইউনিয়ন সংখ্যা: ৮
- আবাদকৃত জমি: ৩১,০৪০ হেক্টর (রোপা আমন)
- সম্ভাব্য অতিরিক্ত সেচ খরচ: ৩৭,২৪,৮০,০০০ টাকা
| বিবরণ | সংখ্যা/অবস্থা |
|---|---|
| ইউনিয়ন যেখানে আমন আবাদ | ৮টি |
| রোপা আমন আবাদকৃত জমি | ৩১,০৪০ হেক্টর |
| আনুমানিক অতিরিক্ত সেচ খরচ | ৩৭ কোটি ২৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা |
প্রান্তিক কৃষকের দুশ্চিন্তা ও সম্ভাব্য ফলপ্রভাব
ক্ষুদ্র ও স্বল্প-আয়শীল কৃষকরা ডিজেল ও সেচ খরচ বৃদ্ধি সামলাতে পারছেন না। ফলস্বরূপ তাদের ক্ষেতের ফলন কমে জেতে পারে, যা পরিবারের আহারের নিরাপত্তা এবং আয়ের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক সময়ে সার, কীটনাশক ও পানি বাস্তবায়ন না হলে ফলন আরও খারাপ হতে পারে।
কী করা উচিত — কৃষি বিভাগের নির্দেশনা
কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীরা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের বলেছেন:
- ক্ষেত পর্যবেক্ষণ বাড়াতে এবং মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখার উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে,
- প্রয়োজনে উপযুক্ত সময়ে সেচ দেওয়া হলেও জলের বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করতে,
- খাদ ও সার ব্যবস্থাপনা ঠিক রেখে রোগবালাই প্রতিরোধ করা।
তবে এসব পরামর্শ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন অর্থাভাবে দুর্বল কৃষকদের সহায়তা ও সমন্বিত উদ্যোগ। স্থানীয়ভাবে সেচ ব্যবস্থার উন্নতি, পাম্প তহবিল বা ডিজেল-সাবসিডি দেওয়া না হলে আগ্রাসী দাবদাহে ক্ষতির পরিমান কমানো সম্ভব হবে না।
নিয়ামতপুরের ব্যাপক আমন আবাদ এবং এতে লক্ষ রাখতে হবে যে, যদি সময়মতো বৃষ্টি না আসে এবং সেচের ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে, তাহলে শুধু এই মৌসুমেরই নয় আগামী মৌসুমেও কৃষকেরা আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং স্থানীয় বাজারে ধান মজুদে প্রভাব পড়বে—যা দূরবর্তী ভবিষ্যতে খাদ্যদাবি ও দর নিয়ন্ত্রণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
উপজেলা পর্যায়ে পরিস্থিতি কেমনভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নির্ভর করছে কৃষি বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষক সম্প্রদায়ের সমন্বিত কাজ ও প্রতিবেশী অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের ওপর। আপাতত কৃষকদের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হল উপযুক্ত সময়ে বৃষ্টি ফিরে আসা এবং মাঠে পানির স্বাভাবিকতা ফিরে পাওয়া।